কারা বেশি কাজে ফাঁকি দেয়, ছেলেরা নাকি মেয়েরা? গবেষণার চোখে আসল সত্য
কর্মক্ষেত্রে পুরুষ নাকি নারী, কারা বেশি কাজে ফাঁকি দেন? সামাজিক বাস্তবতা, মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্বখ্যাত গবেষণার আলোকে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে, অফিসের টেবিলে ফাইলের পাহাড়। এর মধ্যেই কেউ একাগ্র মনে কাজ শেষ করছেন, আবার কেউ মোবাইল স্ক্রল করতে ব্যস্ত। অফিসের অলিখিত এক তর্কের বিষয় হলো—কাজে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে কারা বেশি এগিয়ে, ছেলেরা নাকি মেয়েরা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষক ও মনস্তত্ত্ববিদরা বের করে এনেছেন বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য।
বিশ্বব্যাপী গবেষণা যা বলছে
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর গবেষণা অনুযায়ী, পুরুষরা কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ‘non-work activities’ বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করেন। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা আড্ডা দেওয়া অন্যতম। অন্যদিকে, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীরা কাজে ফাঁকি কম দিলেও অনেক সময় অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে ‘বার্নআউট’ বা তীব্র মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন, যা সাময়িকভাবে তাঁদের কাজের গতি কমিয়ে দেয়।
মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য: ঝুঁকি বনাম নিখুঁত হওয়া
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ছেলেদের মধ্যে ‘risk-taking behavior’ বা ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই অনেক সময় তাঁরা শেষ মুহূর্তের জন্য কাজ ফেলে রাখার ঝুঁকি নেন। বিপরীতে, মেয়েদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও ‘পারফেকশনিজম’ বেশি কাজ করে। তাঁরা কাজ ফেলে রাখতে পছন্দ করেন না ঠিকই, তবে অতিরিক্ত নিখুঁত করতে গিয়ে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে ফেলেন।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট ও সামাজিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের অফিস-সংস্কৃতিতে এই চিত্রটি আরও ভিন্ন। পুরুষ কর্মীরা সাধারণত কাজের ফাঁকে ধূমপান বিরতি, চায়ের আড্ডা বা বাইরে যাওয়ার সুযোগ বেশি পান। তবে নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। তাঁদের অফিসের পাশাপাশি ঘরের কাজ, সন্তান সামলানো ও রান্নার মতো দ্বিমুখী চাপ নিতে হয়। ফলে তাঁরা অফিসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বেশি মনোযোগী হতে বাধ্য হন। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এইচআর কর্মকর্তা মামুন আব্দুল্লাহর মতে, “নারী কর্মীরা সময় মেনে কাজ শেষ করতে সচেতন, তবে অতিরিক্ত চাপে তাঁরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন।”
ডিজিটাল যুগের নতুন ফাঁকি
বর্তমান যুগে ফাঁকি দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার স্মার্টফোন। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা বা অপ্রয়োজনীয় চ্যাট করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই সমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ‘কে বেশি ফাঁকি দেয়’ এই তর্কের চেয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তির ‘ডিজিটাল আসক্তি’ ও ফোকাস করার ক্ষমতা।
শেষ কথা
সব বিশ্লেষণ শেষে এটিই স্পষ্ট যে, কাজে ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা কঠিন। বরং কর্মীর ব্যক্তিগত অভ্যাস, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এবং মানসিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তাঁর কাজের গতি। পেশাদারিত্বের জায়গায় ফাঁকি দেওয়া নয়, বরং সুস্থ কাজের পরিবেশ ও সঠিক মোটিভেশনই পারে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে।


