বেফাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, কীভাবে দেখছেন তরুণ আলেমরা?
কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে 'স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প' চালু করছে বেফাক। ভাষা, কারিগরি ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের তরুণ আলেম ও গবেষকরা।
যাকারিয়া মাহমুদ|
মুজাহিদে আজম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর একটি বিখ্যাত উক্তি- ‘কর্মহীন ধর্মশিক্ষা এবং ধর্মহীন কর্মশিক্ষা—দুটোই জাতির জন্য ক্ষতিকর’। দেরিতে হলেও কওমি মাদরাসা ‘কর্মহীন ধর্মশিক্ষা’র বদনাম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে যাচ্ছে।
গত শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাক—তাদের অফিসিয়াল ফেসবুকে পেজে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—‘কওমী মাদরাসা শিক্ষার্থী ও আগ্রহী আলেমদের জন্য বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দানে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) ‘বেফাক স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ চালু করবে। বিভিন্ন যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার মাধ্যমে কারিগরি, ভাষা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেওয়ার দ্বারা কওমি অঙ্গনের জনশক্তি ও মানব উন্নয়নে বেফাকের নিজস্ব ভবনে শীঘ্রই এ প্রকল্প চালু হবে।’
বেফাকের এই উদ্যোগকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন তরুণ ও নবীন আলেমরা। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে তারা বলছেন, এটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে হতাশায় ভুগতে থাকা কওমি মাদরাসাপড়ুয়াদের অনেকের একটা গতি হবে।
তরুণ আলেম, আলোচক ও ইসলামি গবেষক মুফতি উসামা হাবীব বেফাকের এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘বেফাক খুবই সুন্দর এক উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য বেফাককে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি আত্মসমালোচনা করে বলেন, ‘আসলে জগৎ পরিবর্তনশীল। যুগ-সময় ও শতাব্দীর সাথে সাথে মানুষের চাহিদাও পরিবর্তন হয়। কিন্তু দেখা যায় আমরা কওমিরা যুগের সেই পরিবর্তন ও চাহিদানুসারে পরিবর্তন হতে পারি না। এটা আমারদের ব্যর্থতা।’
মুফতি উসামা হাবীব বলেন, ‘আমাদের এই ব্যর্থতা গোচাতে বেফাকের এই যুগান্তকারী উদ্যোগে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই খুশি। তবে এখানে আমি বলব, বেফাক যেন এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। কদিন পর যেন বরফের মতো জমাট বেঁধে না-যায় এই প্রকল্প। থেমে না-যায়। চারদিকের বিপদাপদ ও বাধা-প্রতিবন্ধতা এড়িয়ে এই প্রকল্প টিকিয়ে রাখা জরুরি।’
তরুণ আলেম, শিক্ষক ও ইসলামি গবেষক মুফতি আবু সাইদও বেফাকের এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিক স্বাগত জানান। তিনি এই প্রকল্পের সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নে বেফাকের প্রতি আরও দুটি প্রস্তাবনা রেখে বলেন, ‘এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তবে এখানে দুটি বিষয় যোগ করা গেলে, আরও ভালো হতো—
এক. শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে বেফাক। যে এই কোর্সে প্রদত্ত সার্টিফিকেট মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত হবে।
দুই. মাদরাসায় যেসব শিক্ষার্থী শরহে বেকায়ার বোর্ড পরীক্ষায় জায়্যিদ স্তরের নিচে ফলাফল করবে তাদের উপরের শ্রেণিতে ওঠা বন্ধ করে দিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের দিকে স্থানান্তরিত করে দেওয়া। যেন গতানুগতিক পড়াশোনায় আর তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়।
নবীন আলেম, লেখক ও শিক্ষক, মাওলানা আলি আহমাদ তার বক্তব্যে বেফাকের প্রতি প্রস্তাবনা রেখে বলেন, বিষয়টা তো আপাতদৃষ্টিতে ভালোই মনে হয়। তবে আমি মনে করি—এটা আরও ভালো ও সুন্দর হয়—যদি এই উদ্যোগ মাদরাসাভিত্তিক করে দেওয়া হয় এবং বড় একটা সময় নিয়ে করা হয়। কারণ, একটা দীর্ঘ সময় পড়ালেখা করে তারপর কোনো বিষয়ের ট্রেনিং নিতে যাওয়া—এটা তো দাওরা শেষে নুরানি প্রশিক্ষণের মতো হয়ে গেল। কারিগরি প্রশিক্ষণ তো এমন কিছু নয় যে, তা দাওরা শেষ করেই শিখতে হবে; বরং দীর্ঘ ১০ বছরের পড়াশোনার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাটাও অল্প অল্প করে দিয়ে দিতে পারলে, ফারেগ হওয়ার পর ট্রেনিংয়ের পেছনে অতিরিক্ত ১ বছর নষ্ট হবে না। ফারেগ হয়েই যোগ্যতানুযায়ী কর্ম শুরু করে দিতে পারবে। এতে সময় যেমন বাঁচবে, শিক্ষাও হবে সার্থক।
বিশিষ্ট কন্টেন্ট রাইটার, প্রুফরিডার রাশেদ মুহাম্মদ— আকাবিরে দেওবন্দের কথা উল্লেখ করে বলেন—‘তারা মাদরাসার মাসিক ভাতা একেবারে চরম দূরাবস্থা না-হলে নিতেন না। বেশির ভাগ উলামায়ে কেরামের ব্যবসা ছিল। কেউ কেউ কিতাবাদির ব্যবসা করতেন। মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরি (রাহিমাহুল্লাহ) তো একপর্যায়ে সকল ভাতা মাদরাসার ফান্ডে জমা দিয়েছেন।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কিন্তু আজকাল এর ব্যতিক্রম চিত্র চোখে পড়ে। উলামায়ে কেরাম হলেন সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। তাদের অর্থনৈতিক হালত যদি উন্নত না হয়, তাহলে দীনি কথা সাধারণ মানুষের পর্যন্ত পৌঁছানো আর সহজ হয়’
এ-সময়ে বেফাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের প্রতি আশা ব্যক্ত করে রাশেদ মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘এ প্রকল্প দেশের তরুণ আলেমদের সফল ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে আশা করি। তবে সংশয় এখানেও থেকে যায়—এই প্রকল্প আদৌ সফলতার মুখ দেখবে কি না! যে বাজেট ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, তা যদি সত্যি কার্যকরী হয় এবং তরুণ আলেমগণ যুগোপযোগী স্কিল অর্জন করে, তাহলে এটা আমাদের দেশের জন্য দারুণ কিছু হবে ইনশাআল্লাহ। একজন আলেমপ্রেমী যুবক হিসেবে আমি চাই, এ প্রজেক্টের দায়িত্বশীলগণ উদাহরণ হিসেবে অথবা মেন্টর হিসেবে আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনকে সামনে রাখবে!’
বেফাকের এই উদ্যোগ আনন্দ আর আশাজাগানিয়া হলেও, বেফাক কতৃপক্ষকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অবকাশ আছে বলে ব্যক্ত করেন—‘নবীন আলেম, লেখক ও সম্পাদক আহমাদ যুবায়ের খান। তিনি বলেন, বেফাক যুগের ভাষা বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছে। তাদের উচিত ছিল এই উদ্যোগ আরও আগে নেয়া। তাহলে কওমির শিক্ষার্থীরা আরও বহুদূর অগ্রসর হতে পারতো।’ একই বক্তব্যে তিনি কওমি সিলেবাসের মানোন্নয়নের বিষয়েও সমালোচনা করেন।
বেফাকের এই যুগান্তকারী উদ্যোগের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে, বাংলাদেশ বেফাক বোর্ডের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী গণমাধ্যমকে বলেন—‘গত দুবছর ধরেই আমাদের এই প্রকল্পের আলোচনা চলছে। যার সিদ্ধান্ত সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। কাজ চলমান। ইনশাআল্লাহ, আমরা আগামী ৬ মাসের ভেতর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করব।’


