গ্রামে ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না: লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ

দেশজুড়ে তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা; বড় শহরগুলোর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত।

Apr 22, 2026 - 10:42
 0  3
গ্রামে ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না: লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ
×

দেশজুড়ে তাপমাত্রার পারদ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিং পরিস্থিতিতে। এপ্রিলের শুরু থেকেই লোডশেডিং যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা মে ও জুন মাসে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

​আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত তিন দিনে দেশের তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করেছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে আবাসিক খাতে ফ্যান ও এসির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি বোরো মৌসুমে সেচ পাম্প চালানোর জন্য কৃষি খাতেও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। তবে চাহিদার এই উল্লম্ফন সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সেই হারে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট।

​এই বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। তথ্যানুসারে, পিক আওয়ারে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৮ শতাংশই কেবল ঢাকা শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে রাজধানীর অনেক এলাকায় লোডশেডিং প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও ঢাকার বাইরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময় বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে বরিশাল অঞ্চল, যেখানে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কিছু কিছু এলাকায় সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম বলে জানা গেছে।

​রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। রাজশাহী বিভাগে দিনে ছয় থেকে আট বার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হচ্ছে, যার ফলে কৃষকরা রাতের পিক লোডের সময় সেচ কাজ সারতে পারছেন না। খুলনা অঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের গ্রামীণ এলাকায় ৫ থেকে ৭ বার বিদ্যুৎ গিয়ে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো উপজেলা পর্যায়ে তো দিনের অর্ধেক সময়ই মানুষকে অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে।

​বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক লুকোচুরি সরাসরি আঘাত হানছে দেশের অর্থনীতিতে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে, যার ফলে গার্মেন্টস ও কারখানার উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকে নেমে এসেছে। নওগাঁ, নাটোর, কুমিল্লা ও কুড়িগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে সেচ পাম্প পর্যাপ্ত সময় চালাতে না পারায় বোরো ফসলের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। পাশাপাশি তাঁত শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের অতিরিক্ত খরচ বইতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়ছে।

​খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিসহ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালে এবং জ্বালানি সরবরাহে উন্নতি না হলে মে-জুন মাসে লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।