কেমন হবে বেফাকের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, কী কী বিষয় শেখানো হবে
কওমি শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করতে ২০টি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করছে বেফাক। সাহিত্য, ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে কারিগরি শিক্ষার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বেফাক সংশ্লিষ্টরা।
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের প্রশংসা সর্বজন বিদিত হলেও অনেকের অভিযোগ—স্কিল ডেভেলপের ক্ষেত্রে তারা বেশ পিছিয়ে। এ অভিযোগের আঁধার কাটিয়ে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা শিক্ষার্থীরা বহু আগে থেকে শুরু করলেও অনেকেই খুঁজে পাচ্ছে না আলোর দিশা। ‘বেফাক স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ যেন সে গাঢ় আঁধারের বুকে জ্বলে ওঠা প্রদীপ। তরুণদের স্কিল ডেভেলপ করা এ সময়ে শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়; বরং অপরিহার্য বিষয়—বেফাক দেরিতে হলেও এর বাস্তবতা বুঝতে পেরে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, অনেকেই সেটাকে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু কেমন হবে এই প্রকল্প? কবে থেকেই-বা শুরু হতে যাচ্ছে? কী কী বিষয় শেখানো হবে কর্মশালায়? খরচাই-বা হবে কেমন? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উঁকি-ঝুকি বিভিন্নজনের মনে। গণমাধ্যমের সঙ্গে বেফাকের দায়িত্বশীল উল্লেখযোগ্য দুজনের আলাপে উঠে এসেছে—এসব প্রশ্নের জবাব।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন—‘গত দুই বছর ধরেই আমরা এই প্রকল্প ঘিরে নানান আলোচনা-পর্যালোচনা করে আসছি। সম্প্রতি যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বেফাকের অফিসিয়াল পেজে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৬ মাসের ভেতর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চলমান।’
প্রকল্পে প্রশিক্ষণের বিষয়সমূহের আলোচনায় তিনি বলেন, ‘সাহিত্য-সাংবাদিকতা, বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা, হাতের লেখা, নানা ধরনের ইলেক্ট্রিক কাজ, মোবাইল সার্ভিসিং, ব্যবসা, ফিন্যান্স ও ফ্রিল্যান্সিংসহ প্রায় ২০টি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণের উদ্যোগ আমরা হাতে নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ আমরা ধীরে ধীরে, প্রথমে ৫টা, তারপর ৮-১০টা করে সবগুলোই বাস্তবায়ন করব। এটা আমাদের একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্ট। ছাত্ররা তাদের চাহিদানুযায়ী প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। এমনকি ১০ জন শিক্ষার্থী একসাথে হয়ে যদি বলে আমরা মান্দারিন ভাষা শিখতে চাই অথবা কোরিয়ান, জাপানিজ ইত্যাদি, আমরা তাদের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হব। আমরা সে বিষয়ে এক্সপার্ট একজনকে সে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগ দিয়ে ১০ ছাত্রের একটা ব্যাচ তৈরি করে, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। কেননা, কওমিপড়ুয়াদের অনেকে ব্যবসার কাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলাফেরা করছে। যার ফলে ইংরেজি ছাড়াও এসব ভাষারও প্রয়োজন পড়ছে অনেক ক্ষেত্রে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা প্রশিক্ষক হিসেবে তাদেরকেই নিয়োগ দেব—যারা ইসলামকে ভালোবাসে এবং আলেমগণের মনের ভাষা বোঝে। মোটকথা, ইসলামি মাইন্ডের হওয়ার পর সে যেখানকারই হোক-না কেন আমরা তাকে নিয়োগ দেব।’
প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা নদভী বলেন, ‘কওমি মাদরাসাপড়ুয়া যেকোনো শিক্ষার্থীই এই প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবে। সে হতে পারে হিফজ সম্পন্ন করেছে বা ইবতিদাইয়্যাহ, নাহুমির অথবা কাফিয়া, শরহে বেকায়া, দাওরা ইত্যাদি পড়েছে। কওমির ছাত্র হলেই আমরা তাদের গ্রহণ করব। এখানে আলেম বা মুফতি হওয়া শর্ত নয়।’
বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘মূলত এ প্রশিক্ষণ তাদের জন্যই যারা পড়ালেখা থেকে অবসর। আর যারা পড়াশোনায় তাদের জন্য পরীক্ষা ও রমজানের ছুটিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তবে এ ব্যবস্থা বিশেষত তাদের জন্যই—যারা আর পড়াশোনা করছে না, চাকরি করছে, পাশাপাশি তারা নিজেদের স্কিল ডেভেলপ করতে চাচ্ছে, আমরা তাদের প্রাধান্য দিব এবং চাহিদানুপাতে তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করব।’
প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসনের ব্যাপারে মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, ‘আপাতত আবাসিক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমরা করতে পারছি না। আবাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন—তা আমাদের নেই। সদ্য বেফাকের যে ১১ তলা বিশিষ্ট ভবনের কাজ সম্পন্ন হলো, সেটা মূলত বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য নির্মিত। এ ভবনের সব ফ্লোর এ কাজেই লেগে যাবে। তাই যারা প্রশিক্ষণ নেবে তাদের আসা-যাওয়া করেই—সেটা করতে হবে।’
তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘তবে খুব শিগগির আবাসিক ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে আমরা উদ্যোগী হব। বেফাকের মূল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৮ তলা বিশিষ্ট ভবনের পরিকল্পনা চলমান, সেটার কাজ আশা করি বছর-কয়েকের ভেতরেই সম্পন্ন হবে। তারপর আমরা বড় কোনো জায়গার ব্যবস্থা করে, সেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসন নির্মাণ করব।’
প্রশিক্ষণার্থীদের ফি ও আনুষাঙ্গিক খরচ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বেফাকের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা খুব কম খরচে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেব। যতটুকু খরচ না-নিলেই নয়; আমরা ঠিক ততটাই নেব।’
কওমি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্কিল ডেভেলপ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি- মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘কওমি শিক্ষার্থীদের চাহিদা আজকাল সব জায়গায় বাড়ছে। তারাও নানাভাবে নিজেদের স্কিল ডেভেলপ করছে। বর্তমানে পরিচিত প্রায় সব মিডিয়ায় কওমির ছেলেরা কাজ করছে। মূলত, ছাত্ররা সউদ্যোগে নিজেদের স্কিল নিয়ে যে সাধনা করছে, সে সাধনার পথ ধরে সে সাফল্যে পৌঁছাতে পারে—আমরা ছাত্রদের সে সাধনার কথা চিন্তা করেই বেফাক স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আয়োজন করেছি। যাতে করে আমাদের ছেলেরা আমাদের ভেতরে থেকেই আরও সহজে এবং কম খরচে নিজেদের স্কিল ডেভেলপ করতে পারে।’
দেশে কওমিপড়ুয়াদের সংখ্যা যেভাবে দিনদিন বাড়ছে, সেভাবে তাদের কর্মসংস্থান বাড়ছে না, তাই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি এবং দীনের স্বার্থে কওমিপড়ুয়াদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাই বেফাকের উদ্দেশ্য বলে জানান প্রভাবশালী এই সহসভাপতি।
আলোচিত এই প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা বেফাক করবে কি না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আসলে সবাই তো চায় নিজেদের ছাত্রদের সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে, আমরাও এটা খেয়াল রাখব। আমরা কাজ শুরু করলে আশা করি বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের কাছে কর্মীর চাওয়া হবে। যদি এমনটা হয়, তাহলে আমরা আমাদের প্রশিক্ষণার্থীদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া নিজেদের দায়িত্ব মনে করি।’
সারাদেশে এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী আছেন যারা, নিজেদের স্কিল ডেভেলপে আগ্রহী। কিন্তু ঢাকার বাইরে থাকায় অনেকেই সুবিধা করতে পারেন না। তাদের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা-বিভাগে বেফাকের এই প্রকল্প ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাওয়া হলে মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন জানান, ‘আমার জানা মতে সারাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে কম্পিউটার ও আইটি বিভাগ চালু করা হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত জায়গা থেকে তাদের এই কার্যক্রম ও কর্মতৎপরতাকে স্বাগত জানাই। তবে বেফাকের এই প্রকল্প সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে কি না—এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’
একই প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, ‘আমাদের এই প্রকল্প তো সবে শুরু হতে যাচ্ছে। যদি আমরা এর ভালো সারা পাই তাহলে, যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে আমরা প্রস্তুত। ঢাকার বাইরের মাদরাসাগুলো যদি বেফাকের এই প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে চায় এবং জায়গার ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে বেফাকের পক্ষ থেকে সেটাকে কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হবে এবং ছাত্রদের প্রশিক্ষণের জন্য যেন ঢাকা আসতে না-হয়; বরং আপন জেলা-বিভাগে থেকে নিজেকে আগামী দিনের জন্য গড়তে পারে—সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সবশেষে তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত কারিগরি বোর্ডের সাথে আমরা শিগগির যোগাযোগ করব, যাতে করে বেফাক থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীরা, সরকারি সার্টিফিকেট নিয়ে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারে।’


