সীমাহীন ডিউটি, স্বল্প বেতন: পুলিশ কনস্টেবলদের আড়ালে থাকা দুঃসহ জীবন

গালি আর অপবাদ সহ্য করলেও আড়ালে থেকে যায় পুলিশ কনস্টেবলদের নুন আনতে পান্তা ফুরানো যাপন। ঢাকায় আবাসন সংকট, স্বল্প বেতন আর ১৬-১৮ ঘণ্টার ডিউটির চাপে পিষ্ট তাদের জীবন।

May 9, 2026 - 22:40
 0  3
সীমাহীন ডিউটি, স্বল্প বেতন: পুলিশ কনস্টেবলদের আড়ালে থাকা দুঃসহ জীবন
×

সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ মানেই ক্ষমতার দাপট কিংবা দুর্নীতির তকমা। রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে পুলিশের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া বা তাদের গালি দেওয়া যেন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই উর্দিধারী মানুষগুলোর ভেতরের জীবন যে কতটা করুণ এবং দারিদ্র্যপীড়িত, তা সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ খুব কম। বিশেষ করে কনস্টেবল পর্যায়ে যারা চাকরি করছেন, তাদের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রামের গল্প।

সাড়ে ১৪ হাজার থেকে ৩৮ হাজার: ২২ বছরের প্রাপ্তি:

জহুরুল (ছদ্মনাম) গত ২২ বছর ধরে পুলিশে আছেন। শুরুতে বেতন ছিল সাড়ে ১৪ হাজার, যা বর্তমানে ৩৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই ২২ বছরেও তার পদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকায় সংসার চালাতে গিয়ে তাকে প্রতিদিন হিমশিম খেতে হচ্ছে। জহুরুল আক্ষেপ করে বলেন, "মেয়েটা দামি খেলনা বা সাইকেল চাইলে বাবা হিসেবে কিনে দিতে পারি না। সরকার যা বেতন দেয়, তা দিয়ে ডাল-ভাত খেতেই সব শেষ হয়ে যায়।"

বেতনের অংক ও বর্তমান বাজার:

একজন কনস্টেবল শুরুতে বেসিক বেতন পান মাত্র ৯ হাজার টাকা। ডিএমপিতে সব মিলিয়ে পান সাড়ে ১৬ হাজার টাকা। টিফিন ভাতা দৈনিক মাত্র ১০ টাকা, যা বর্তমান বাজারে একটি সিঙাড়া আর এক কাপ চায়ের দামের চেয়েও কম। চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ এবং ধোলাই ভাতা মাত্র ৩০০ টাকা। বাড়িভাড়া হিসেবে যা দেওয়া হয়, তা দিয়ে ঢাকার বস্তি এলাকাতেও একটি রুম পাওয়া অসম্ভব। ফলে কনস্টেবলদের বিশাল একটি অংশ পরিবারকে গ্রামে রেখে নিজে ব্যারাকে মানবেতর জীবনযাপন করেন।

১৬-১৮ ঘণ্টার ডিউটি, নেই ছুটি:

পুলিশের ডিউটি খাতা-কলমে ৮ ঘণ্টা হলেও মাঠপর্যায়ে তা প্রায়ই ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকে। রাজনৈতিক মিছিল, সমাবেশ কিংবা ভিআইপি প্রটোকল থাকলে বিশ্রামের সুযোগটুকুও মেলে না। উত্তরার এক থানায় কর্মরত জিয়া (ছদ্মনাম) জানান, "অসুস্থ হলেও ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ছুটি মেলে না। অতিরিক্ত ডিউটির জন্য কোনো বাড়তি ভাতাও নেই।" এই দুঃসহ চাপের মাঝেও তাদের হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করতে হয়, যার প্রতিদান সমাজ দেয় অবজ্ঞা আর গালি দিয়ে।

গালি বনাম বাস্তবতা:

জনগণের ধারণা, পুলিশ মানেই উপরি আয়। রংপুরের এক কনস্টেবল আবদাল (ছদ্মনাম) বলেন, "বন্ধুরা বলে তোদের তো টাকার অভাব নেই, চায়ের বিলটা তুই দে। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারি না আমার বেতন একজন ইটভাটার শ্রমিকের চেয়েও কম। পকেটে টাকা নেই—এই কথা পুলিশের পোশাকে বলাও যায় না।" এক কেজি গরুর মাংস কেনা যাদের জন্য বিলাসিতা, তাদের ওপরই সমাজ দুর্নীতির দায় চাপায়।

মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ:

পরিবার থেকে দূরে থাকায় সন্তানদের সঠিক যত্ন নিতে পারেন না অনেক সদস্য। অর্থের অভাবে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। কনস্টেবলদের দাবি, বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা হোক। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দুঃসহ জীবনযাপন ও আর্থিক অনটনই অনেক সদস্যকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিপথগামী বা দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হলে সেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে দুর্নীতির প্রবণতা।

​#পুলিশ #কনস্টেবল #জীবনযুদ্ধ #স্বল্প_বেতন #আবাসন_সংকট #পুলিশ_সংবাদ #বাংলাদেশ_পুলিশ #PoliceLife #Struggle #SalaryCrisis #PressPoint