সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংশয়: জমানো টাকা কবে পাবেন দিশেহারা গ্রাহক?

তারল্য সংকটে থাকা ৫টি ব্যাংক নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ও নতুন ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ নিয়ে বিতর্ক গ্রাহকদের আমানত ফেরতের পথকে দীর্ঘায়িত করছে।

May 13, 2026 - 10:41
 0  4
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংশয়: জমানো টাকা কবে পাবেন দিশেহারা গ্রাহক?
×

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হলেও সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা কাটছে না। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা এসব ব্যাংক নিয়ে এখন নতুন করে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

​গ্রাহকদের আর্তনাদ ও আন্দোলন:

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের তিন ব্যাংকে আটকে আছে ৩ কোটি টাকা। গত দেড় বছরে তিনি তুলতে পেরেছেন মাত্র ৭ লাখ টাকা। তাঁর মতো হাজারো গ্রাহক এখন রাজপথে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ব্যাংকগুলোর শাখায় তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা। তাদের প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে ব্যাংক একীভূত হলেও টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়?

​কেন অনিশ্চয়তা বাড়ছে?

গত বছরের ডিসেম্বরে এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন এবং এসআইবিএল-কে একীভূত করা হয়। কিন্তু মাত্র ৫ মাসের মাথায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) এই কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করায় পুরো প্রক্রিয়াটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচটি ভিন্ন সংস্কৃতির রুগ্ন ব্যাংককে জোর করে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা শুরু থেকেই ছিল ভুল।

​আইন নিয়ে বিতর্ক ও পুরোনো মালিকদের ফেরার শঙ্কা:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাশ হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এই আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি। অভিযোগ উঠছে, এই ধারার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎকারী সাবেক মালিকদের আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বস্ত করেছেন যে অপরাধীদের ফেরার সুযোগ হবে না, কিন্তু এসআইবিএল-এর বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন সেই সংশয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

​অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ:

বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, "ভালোর সঙ্গে খারাপের মার্জার হতে পারে, কিন্তু সবগুলো খারাপকে একসঙ্গে মার্জ করলে ফলাফল শূন্যই থাকে।" তিনি মনে করেন, জোরপূর্বক একীভূতকরণ নয়, বরং স্বচ্ছ ও স্বেচ্ছামূলক প্রক্রিয়ায় রিফর্ম না করলে মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

​অধ্যাপক ড. আহসান হাবীবের মতে, ব্যাংকগুলোর এই অবস্থার জন্য রাষ্ট্রীয় অথরিটি ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম দায়ী, তাই দায় সরকারকেও নিতে হবে। তিনি গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেও স্বীকার করেছেন যে, এখন পর্যন্ত কোনো দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখায়নি।

​বর্তমান পরিস্থিতি:

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও আন্তঃব্যাংক সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে প্রক্রিয়াটি অব্যাহত থাকবে, কিন্তু গ্রাহকদের জমানো টাকা ফেরতের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে।