টাকা জোগাড় করে আসার পর মেয়েটাই মারা গেল: ঢামেকে রাইসার নিথর দেহ কোলে বাবার আকুতি

ফরিদপুর থেকে টাকা জোগাড় করে ঢাকায় আসার পর হামের জটিলতায় মারা গেল ৫ মাসের শিশু রাইসা। ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রাইসার নিথর দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে দিশেহারা বাবা-মা।

May 14, 2026 - 14:26
 0  5
টাকা জোগাড় করে আসার পর মেয়েটাই মারা গেল: ঢামেকে রাইসার নিথর দেহ কোলে বাবার আকুতি
×

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাঁচ মাস বয়সী যমজ সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক দম্পতি। তাদের মধ্যে স্বামী মো. কামরুজ্জামানের কোলে একজনের নিথর দেহ, পাশে হামে অসুস্থ অপর সন্তানকে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দাঁড়িয়ে স্ত্রী জান্নাতি বেগম। টাকার অভাবে সঠিক সময়ে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে মা জান্নাতি বলছিলেন, ‘টাকার জন্য আসতে পারিনি। টাকা জোগাড় করে আসার পর মেয়েটাই মারা গেল।’

আর্থিক সংকট ও করুণ মৃত্যু:

পাঁচ মাস আগে ঢাকা মেডিকেলেই জন্ম হয়েছিল যমজ শিশু রাইসা ও রুমাইসার। জন্মের পর নানা জটিলতায় ১৫ দিন তাদের বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে (এনআইসিইউ) রাখতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয় পরিবারটি। সম্প্রতি দুই শিশুই হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ৯ দিন চিকিৎসা চলে। রাইসার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তিন দিন আগেই তাকে পিআইসিইউ (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ও চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই পার হয়ে যায় মহামূল্যবান তিনটি দিন। বুধবার (১৩ মে) সকালে ফরিদপুর থেকে ঢামেকে পৌঁছানোর পর বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রাইসা।

হাসপাতালের সনদ ও বাড়ি ফেরার আকুতি:

হাসপাতালের মৃত্যুসনদে 'হাম-পরবর্তী জটিলতা'-কে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাইসার মরদেহ নিয়ে ফরিদপুরে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথও সহজ নয় দিনমজুর কামরুজ্জামানের জন্য। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া লাগবে পাঁচ হাজার টাকার বেশি, যা দেওয়ার মতো সম্বল এই মুহূর্তে তাঁর কাছে নেই। রাইসার নানি-দাদিরা যে ব্যাগ নিয়ে এসেছিলেন, তাতে এখনও রয়ে গেছে দুই শিশুর দুধের কৌটা ও জামাকাপড়। সুস্থ করে সন্তানদের বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসে লাশ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে পরিবারটিকে।

দেশজুড়ে পিআইসিইউ ও হামের ভয়াবহ সংকট:

চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা পিআইসিইউ না থাকায় জটিল রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে তীব্র শয্যা সংকট।

​ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, "হাসপাতালে মাত্র ১৭টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে, যা আমাদের নিজস্ব রোগীদের জন্যই পর্যাপ্ত নয়। ফলে বাইরে থেকে আসা আশঙ্কাজনক রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই সিট দেওয়া সম্ভব হয় না।"

​স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া, ঢাকার বাইরে আইসিইউ অবকাঠামোর চরম সীমাবদ্ধতা এবং ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত রাইসার মতো শত শত নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা অকালে ঝরে যাচ্ছে।