সম্ভ্রম দিয়ে পরিবার বাঁচানো বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী আর নেই: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়
একাত্তরের সেই দুঃসহ স্মৃতি আর সমাজের অবজ্ঞা সঙ্গী করে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়া বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী আর নেই। ঠাকুরগাঁওয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হলো তাঁর শেষকৃত্য।
একাত্তরের সেই দুঃসহ স্মৃতি আর সমাজের অবজ্ঞা সঙ্গী করে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়া অকুতোভয় বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী আর নেই। মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান:
বুধবার (১৩ মে) সকাল ১০টায় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই ত্যাগী জননীকে শেষ বিদায় জানান। জীবদ্দশায় টেপরি রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো বিদায়, যা রাষ্ট্রীয় সম্মানের মধ্য দিয়ে পূরণ হলো।
সেই কালরাত ও বাবার অসহায়ত্ব:
১৯৭১ সালে পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষায় নিজের কিশোরী মেয়েকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এক অসহায় বাবা। দীর্ঘ সাত মাস সেই নরককুণ্ডে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন টেপরি রাণী। সেই দুঃসহ পথের স্মৃতি আর বাবার চোখের জল আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।
যুদ্ধশিশু ও সামাজিক গ্লানির লড়াই:
দেশ স্বাধীনের পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন টেপরি। জন্ম হয় পুত্র সুধীর বর্মনের। স্বাধীন দেশেও সুধীরকে সইতে হয়েছে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’র মতো নিষ্ঠুর সামাজিক গঞ্জনা। পেশায় ভ্যানচালক সুধীর আজও তাঁর বাটন ফোনে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি রিংটোন হিসেবে বাজিয়ে মায়ের ত্যাগের উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন।
ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব:
২০১৭ সালে বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান টেপরি রাণী। ২০১৮ সালে তাঁর জীবনের গল্প জনসমক্ষে এলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বলেন, "টেপরি রাণী কেবল একজন নারী নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার এক অবিচল স্তম্ভ।"
এক বুক অভিমান আর ত্যাগের মহিমা নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের এই বীরাঙ্গনা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রইলেন। তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় জনপদ ও মুক্তিযোদ্ধা মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


