সিন্ডিকেটের দাপট আর মিডিয়া ট্রায়ালে খামার ছাড়ছেন উদ্যোক্তারা!
গোখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেটের দাপট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের শত শত গরুর খামার। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারা।
দেশের গবাদি পশুর (ক্যাটল) ব্যবসায় গভীর অনিশ্চয়তা ও মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। গোখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দাপট, অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয়, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ অবহেলায় এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে।
এক সময় যে খাতে দেশের শিক্ষিত তরুণ, করপোরেট পেশাজীবী ও বড় বড় বিনিয়োগকারীরা বিপুল আগ্রহ নিয়ে যুক্ত হয়েছিলেন, এখন তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে খামার বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। খামারিদের দাবি, এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ক্যাটল শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
গোখাদ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা ও আকাশচুম্বী খরচ:
খামারিদের প্রধান অভিযোগ, গোখাদ্যের বাজারে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীলতা নেই। ডেমরার সামারাই ক্যাটল ফার্মের ব্যবস্থাপক ওয়াহিদুজ্জামান খান জানান, "সবচেয়ে বড় সংকট এখন গোখাদ্যের সিন্ডিকেট। সকাল, বিকেল ও রাতে সিন্ডিকেটের কারণে দাম পরিবর্তন হচ্ছে। গত বছর যে খাদ্য ১,৮০০ থেকে ২,১০০ টাকায় কেনা যেত, এবার তা ৩,৮০০ থেকে ৩,৯০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।"
বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি কেজি গমের খোসা (চেলটি) ৫৫-৬০ টাকা, খুদ ৫৫ টাকা, ভাঙানো ভুট্টা ৪৫ টাকা, প্রতি আঁটি ঘাস বা কাঁঠাল পাতা ২০ টাকা এবং বিছালি ৬-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আগে যে রাখাল ১৫-২০ হাজার টাকায় কাজ করতেন, এখন ৩০-৩৫ হাজার টাকার নিচে মিলছেন না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কয়েকগুণ বর্ধিত বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন ব্যয়। খামারিদের দাবি, বিভিন্ন প্রতিকূলতায় গত ৫ বছরে দেশে গরু পালনের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
নতুন আপদ ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ আতঙ্ক:
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বা ট্রল সংস্কৃতি এই শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করেছে। গরুর দাম, খামারের পরিবেশ বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অনলাইনে ট্রল ও অযাচিত বিতর্কের আশঙ্কায় অনেক বড় উদ্যোক্তা এবং ক্রেতা এখন খামারে আসতে ভয় পাচ্ছেন।
উদ্যোক্তারা জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে যেভাবে ফেসবুকে ঢালাও আলোচনা ও মিডিয়া ট্রায়াল হয়, তাতে সম্মানহানির ভয়ে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে বিদেশে চলে গেছেন কিংবা অন্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন। অনেক ক্রেতা এখন খামারে এসে ছবি বা ভিডিও ধারণ হোক, তা চান না। ফলে বেচাকেনার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
ক্রেতাদের হাহাকার ও মাঝারি গরুর চাহিদা:
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাজারে গরুর দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলছে। খামারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম ও শিক্ষার্থী তানভীর হাসান জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে খামারিরা দাম ছাড়ছেন না, কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় তো সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ক্রেতারা এখন বড় গরুর আশা ছেড়ে ছোট ও মাঝারি (১ থেকে দেড় লাখ টাকা দামের) গরুর দিকে ঝুঁকছেন।
বসিলা এলাকার ‘দ্যা নিউ ক্যাটেল’-এর খামারি আনিসুজ্জামান জানান, বাজারে বড় গরুর চেয়ে মাঝারি গরুর খোঁজই বেশি। একটি বড় গরু তৈরি করতে ৪-৫ বছর সময় ও লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে সেই গরু আরও এক বছর লালন-পালন করতে গেলে খামারিকে সম্পূর্ণ লোকসান গুনতে হয়, যা সাধারণ ক্রেতারা বুঝতে চান না।
নীতিগত সহায়তার অভাব:
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BDFA) সিনিয়র সহ-সভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, "খাবারের দাম, পরিবহন ও রাখাল মজুরিসহ সবকিছু হিসাব করলে আগে যে মাঝারি সাইজের একটি গরু ১ লাখ টাকায় বিক্রি হতো, সেটি এখন উৎপাদন খরচের কারণে দেড় লাখের নিচে বিক্রি করা অসম্ভব।" খামারিরা সরকারের কাছে কোনো অনুদান চান না, তাঁরা চান কার্যকর নীতিগত সহায়তা, ভ্রূণ প্রযুক্তির স্বাধীনতা, কঠোর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সম্মানের সঙ্গে কাজ করার সুষ্ঠু পরিবেশ।
মন্ত্রণালয়ের দাবি: পশুর সংকট নেই
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, "আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশে কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। দেশীয় খামারিদের প্রস্তুত করা পশু দিয়েই এবার কোরবানি সম্পন্ন হবে। এ জন্য প্রায় এক কোটির বেশি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে বিদেশ থেকে কোনো পশু আমদানির প্রয়োজন হবে না।"


