রাজধানীর পশুর হাটে বেচাকেনায় টানাপোড়েন: ক্রেতাদের চোখে দাম চড়া, লোকসানের আশঙ্কায় বেপারীরা

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটে কেনাবেচা শুরু হলেও জমে ওঠেনি বাজার। দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মাঝে তৈরি হয়েছে চরম টানাপোড়েন।

May 23, 2026 - 19:49
 0  2
রাজধানীর পশুর হাটে বেচাকেনায় টানাপোড়েন: ক্রেতাদের চোখে দাম চড়া, লোকসানের আশঙ্কায় বেপারীরা
×

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানির পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিক দিনগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যকার দরদামের টানাপোড়েনের কারণে বাজার এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। হাটে আসা সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ— এবার পশুর দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেপারী ও খামারিরা বলছেন, গোখাদ্য, খামারের পরিচর্যা এবং পরিবহন খরচ ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় দাম কমানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

​হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতি বুঝতে দুপক্ষই এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করছে। মূলত রোববার থেকে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়বে এবং ঈদের আগের শেষ দুই দিন— অর্থাৎ মঙ্গলবার ও বুধবার কেনাবেচা চরম জাঁকজমক রূপ নেবে।

খামারি ও বেপারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ:

রাজধানীর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গায় বসানো অস্থায়ী পশুর হাটে ঝিনাইদহের ‘তিশান তানিশা এগ্রো ফার্ম’-এর কর্ণধার তোজাম্মেল হক এবার ৫২টি গরু নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাছে দেড় লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দামের গরু রয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) রাত পর্যন্ত তিনি মাত্র ২টি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন।

​তোজাম্মেল হক বলেন, "গরু দেখতে অনেকেই আসছেন। কিন্তু দাম শুনেই আর দাঁড়াচ্ছেন না, চলে যাচ্ছেন। গতবার এই সময়ে ক্রেতারা কমবেশি দাম হাঁকাতেন, এবার সেই সাড়াশব্দ নেই।"

​একই হাটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে আসা ‘পায়াস্কিনী এগ্রো’র ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন মির্জা ইমন। দীর্ঘ দুই বছর ধরে প্রাকৃতিকভাবে লালন-পালন করা এসব গরুর বিষয়ে তাঁর সহযোগী মো. দিল্লু বলেন, "আমরা ফিট খাইয়ে ৩ মাসে গরু বড় করিনি। অনেক খরচ হয়েছে। কিন্তু হাটে কাস্টমাররা যে দাম বলছেন, তাতে এবার বড় ধরনের লোকসানের মুখ দেখার আশঙ্কায় আছি।" সিরাজগঞ্জের বেলাল বেপারী আড়াই থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা মূল্যের ১৪টি বড় গরু নিয়ে এসেও একই কারণে লোকসানের ধোঁয়াশায় ভুগছেন। চুয়াডাঙ্গার ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম ও ফেনীর খামারি স্বপন হাছানসহ অন্য বেপারীরাও বাজারের এই মন্দাভাবে উৎকণ্ঠিত।

ক্রেতাদের দাবি— দাম সাধ্যের বাইরে:

হাটে আসা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বলছেন, বিক্রেতারা যে দাম চাচ্ছেন, তাতে স্বাভাবিক দামাদামি করার সাহসই পাওয়া যাচ্ছে না। বাসাবো এলাকা থেকে সস্ত্রীক গরু কিনতে আসা জাহিদুল ইসলাম আসিফ শাহজাহানপুর হাটে একটি গরুর দামাদামি করছিলেন।

​আসিফ বলেন, "যে মাঝারি গরুটির দাম ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে, বিক্রেতা ১ লাখ ৬৫ হাজারের নিচে তা ছাড়বেন না। অথচ গত বছর ঠিক এমন সাইজের গরু ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আমি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বলার পরও তাঁরা রাজি হননি। বাধ্য হয়ে আজ না কিনে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই বাড়ি ফিরছি।"

​একই হাটে খিলগাঁও যুব উন্নয়ন অফিসার আবুল কালাম আজাদ বলেন, "ব্যবসায়ীরা কেনার মতো কোনো দামই বলছেন না। আকাশচুম্বী দামের কারণে আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।" তবে এর মধ্যেই খিলগাঁও আনসার হেডকোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা তানভীর ১ লাখ ৮১ হাজার টাকায় একটি মাঝারি সাইজের ষাঁড় কিনে হাসিল জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "দাম গতবারের চেয়ে একটু বেশি মনে হলেও কোরবানি তো দিতেই হবে, তাই কিনে ফেললাম।"

হাট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন:

শাহজাহানপুর পশুর হাটের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা আসলাম পারভেজ বাজার পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়ন করে বলেন, "ঢাকার বেশিরভাগ মানুষের বাসায় কোরবানির পশু রাখার পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। তাই তাঁরা সাধারণত ঈদের মাত্র দুই-তিন দিন আগে কেনা পছন্দ করেন। আরও এক-দুই দিন পর বাজার পুরোপুরি জমবে। বিকিকিনি পুরোদমে শুরু না হওয়া পর্যন্ত এবার কার লাভ বা কার লোকসান হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।"