প্রকাশ্যে এলো রামিসা হত্যাকাণ্ডের আসামি সোহেলের যত অপকর্ম

রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা হত্যার প্রধান আসামি সোহেল রানার অন্ধকার অতীত ও অপরাধের চিত্র সামনে এসেছে। মাদক, জুয়া ও পারিবারিক কেলেঙ্কারির কারণে গ্রামছাড়া ছিল সে।

May 22, 2026 - 10:21
 0  3
প্রকাশ্যে এলো রামিসা হত্যাকাণ্ডের আসামি সোহেলের যত অপকর্ম
×

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি সোহেল রানার একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপকর্মের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, সোহেল রানা শুধু একজন মাদকাসক্তই নয়, বরং তার পুরো অতীত জীবনই পরকীয়া, অনলাইন জুয়া, দেনা এবং নানামুখী অপরাধে জর্জরিত ছিল। এসব অপকর্মের কারণেই নিজের গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে সে ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেছিল।

ভাঙা সংসার ও ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া:

অনুসন্ধানে জানা যায়, খুনি সোহেল রানার মূল বাড়ি নাটোর জেলার মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে। সেখানে সে স্থানীয়ভাবে রিকশা মেরামতের কাজ করত। প্রায় ১০ বছর আগে সে প্রথম বিয়ে করে এবং সেই সংসারে তার একটি সন্তানও রয়েছে। তবে প্রথম স্ত্রীর সাথে সংসার করাকালেই সে নিজের আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে লম্পট ও অনৈতিক পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এই পারিবারিক কেলেঙ্কারি ও চারিত্রিক স্খলনের জেরে প্রথম স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দেয় এবং দীর্ঘ ১০ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। এরপর গত তিন বছর আগে পাশের গ্রামে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে।

অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তিতে গ্রামছাড়া:

এলাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে চরমভাবে ইয়াবা সেবন এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিল। জুয়া খেলতে গিয়ে সে বিপুল পরিমাণ অর্থ হেরে যায় এবং লাখ লাখ টাকা ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। পাওনাদারদের চাপ এবং পরিবারের সদস্যদের ধিক্কারের মুখে একপর্যায়ে তিন বছর আগে পরিবার ও এলাকা থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয়ে সে ঢাকায় পালিয়ে আসে।

​সোহেল রানার আপন ছোট বোন জলি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মাদক, জুয়াসহ নানা অপকর্মের কারণে তিন বছর আগেই পরিবার থেকে ওকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন আমাদের সাথে ওর কোনো যোগাযোগ নেই। সে মা-বাবার কোনো খোঁজখবর নেয় না, কোনো খরচও দেয় না।"

ঢাকায় এসেও স্বভাব অপরিবর্তিত, বিহারি ক্যাম্প থেকে বহিষ্কার:

ঢাকায় এসে মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় অবস্থান নেওয়ার পরও তার অপরাধপ্রবণতা কমেনি। একই গ্রামের সাদ্দাম ও হানিফের সুপারিশে ৬ মাস আগে সে মিরপুর বিহারি ক্যাম্পের একটি বাসায় সাবলেট ভাড়া নেয়। কিন্তু সেখানেও দিন-রাত উগ্রভাবে ইয়াবা সেবন করার কারণে বাড়ির মালিক তাকে বাসা থেকে বের করে দেন।

​বিহারি ক্যাম্পের ওই বাড়ির মালিক বলেন, "আমার বাসায় সে মাত্র দুই মাস ছিল। সোহেল দিন-রাত ইয়াবা সেবন করত। আমার স্ত্রী ও পরিবার এগুলো মোটেও পছন্দ করে না। এ কারণে আমরা ওরে আমাদের বাসা থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিছি।"

​গ্যারেজের চাকরিচ্যুতি ও সর্বশেষ নির্মমতা:

পরবর্তীতে পল্লবীর যে ফ্ল্যাটে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেই বাসার কেয়ারটেকার মনির পরিচিতদের সুপারিশে সোহেলকে নিজের গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ দিয়েছিলেন। কেয়ারটেকার মনির বলেন, "মিস্ত্রি হিসেবে ওকে কাজে নেওয়ার পর ১৫ দিন ওর হাবভাব দেখলাম। ও নিয়মিত কাজে আসত না, একদিন এলে তিনদিন গায়েব থাকত। ওর আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আমি গ্যারেজ থেকে ওরে না করে (চাকরিচ্যুত) দিই।"

​এরপর ওই ভবনেরই অন্য একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট রুম ভাড়া নেয় সোহেল ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী স্বপ্না। সেখানেই গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে ইয়াবার চরম নেশায় বুঁদ হয়ে ৭ বছরের অবুজ শিশু রামিসাকে ঘরে ডেকে নিয়ে যায় সে। এরপর জোরপূর্বক বাথরুমে ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে মাথা আলাদা করে ফেলে।

​পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজ ও পরিবারের অবহেলা এবং মাদক-জুয়ায় আসক্ত এই অপরাধীকে আরও আগে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে হয়তো অবুজ শিশু রামিসাকে এভাবে প্রাণ হারাতে হতো না।