বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে ৬৫ ভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মুক্ত: প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন

বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় দেশের ৬৫ শতাংশ নিম্নআয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে মূল্যবৃদ্ধির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী।

Jun 6, 2026 - 13:34
 0  2
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে ৬৫ ভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মুক্ত: প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন
×

বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষিত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির রুটিন সিদ্ধান্তের আওতা থেকে দেশের মোট ৬৫ শতাংশ প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়েছে।

​আজ শনিবার (৬ জুন) সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় প্রসঙ্গে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।

​প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি এবং মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক প্রেক্ষাপট সংবলিত লিখিত বক্তব্য গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এ সময় তথ্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিত্তবানদের ওপর চাপ বাড়লেও সুরক্ষিত প্রান্তিক মানুষ:

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বিইআরসি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আধা-বিচারিক (Judicial Authority) প্রতিষ্ঠান। তারা সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মাপকাঠির ভিত্তিতে তাদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ হিসেবে এই মূল্য সমন্বয় করেছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান সংকল্পই ছিল দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। ফলে বিইআরসি-র পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের আংশিক সংশোধন করে শতকরা ৬৫ ভাগ সাধারণ ও নিম্নআয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে এই মূল্যবৃদ্ধির বাড়তি চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সমাজের বিত্তবান ও উচ্চ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপর কিছুটা চাপ পড়লেও সাধারণ মানুষ সুরক্ষিত থাকবে।”

অতীতের নীতিগত ভুল ও আমদানিনির্ভরতা:

বিদ্যুৎ সংকটের ঐতিহাসিক কারণ ব্যাখ্যা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমস্ত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দেশগুলো বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত ২০ বছর ধরে যদি আমাদের দেশের মাটির নিচে আবিষ্কৃত ও চিহ্নিত নিজস্ব খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের সঠিক, দূরদর্শী ও জাতীয় শিক্ষণীয় নীতিমালা থাকত, তবে আজ আমাদের এতটা আমদানিনির্ভর হতে হতো না। পূর্ববর্তী শাসকদের নীতিমালার চরম ভুলের কারণেই আজ আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্যতম বৈশ্বিক সংকটে আমরা এতটা বড় আঘাতপ্রাপ্ত ও সংকুচিত হয়ে পড়েছি।”

আওয়ামী লীগের লুটপাটের চক্র ভাঙতে সময় লাগবে:

পতিত শেখ হাসিনা সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, “গত এক থেকে দেড় দশক ধরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ও রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের নামে যে ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সুসংগঠিত লুটপাটের কালো চক্র তৈরি করা হয়েছে, তা আপনাদের সবার সামনেই ঘটেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অপরাধ ও দুর্নীতির গভীর চক্র থেকে পুরো জ্বালানি খাতকে বের করে এনে একটি স্বচ্ছ ও সুস্থ ধারায় ফেরাতে বর্তমান প্রশাসনের কিছুটা সময় লাগবে। তবে এই খাতের মাফিয়াতন্ত্র ভাঙতে বর্তমান সরকারের সংকল্প অত্যন্ত পরিষ্কার ও দৃঢ়।”

কালো টাকার অপরাধের বোঝা বহন করতে হচ্ছে:

মন্ত্রী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে এখনো প্রতি বছর ৪১ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের লোকসানি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অথচ দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) কিংবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির (Informal Economy) বিশাল আকারের দিকে তাকালে এই ৪১ হাজার কোটি টাকা কিছুই না। বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে যারা ব্যাংকিং খাতে অপরাধ করে বিপুল পরিমাণ কালো টাকার মালিক হয়েছেন এবং বিদেশে অবৈধভাবে দেশের সম্পদ পাচার করেছেন, মূলত তাদের সেই অর্থনৈতিক অপরাধের বড় খেসারত ও বোঝাই আজকের এই সংকটময় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে বহন করতে হচ্ছে।”

​বিবৃতির শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছাড়াই জনগণের স্বার্থে সরকার, গণমাধ্যম ও আমজনতার মধ্যে একটি নিয়মিত ও তথ্য প্রবাহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি দেশের এই রূপান্তরকালীন সময়ে জনগণকে সচেতন রাখার জন্য স্বাধীন গণমাধ্যমকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।