বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ত্রিমুখী ধাক্কা: মধ্য ও নিম্নবিত্তের খরচের চাপ আরও বাড়বে, জীবনযাত্রা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা
দেশে জ্বালানি তেল, এলপিজি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ায় চরম সংকটে মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। মূল্যস্ফীতি ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছানোয় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির করাল গ্রাসে দেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই চিড়েচ্যাপ্টা। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার প্রতিটি ধাপে খরচ কেবলই বাড়ছে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মাঝেই বৈশ্বিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে দেশে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। একই সাথে রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) খরচও এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়েছে। এর ওপর নতুন করে দুশ্চিন্তার খড়্গ হয়ে এসেছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন— তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের এই ত্রিমুখী মূল্যবৃদ্ধি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কৃষি, পণ্য সংরক্ষণ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন এবং সেবা খাতের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত বোঝা এসে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন মধ্য ও নিম্নবিত্তরা, যাদের দৈনন্দিন টিকে থাকা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ পার, ভালো নেই কেউ:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের মার্চ মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। মার্চের চেয়ে এপ্রিলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতের মূল্যস্ফীতিই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে, যা যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৯ এবং ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষক ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাবেক সভাপতি এবং সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান বলেন, “জীবনযাত্রার খরচের প্রচণ্ড চাপে মানুষ মোটেও ভালো নেই। এর মধ্যে যারা নির্দিষ্ট আয়ের (ফিক্সড ইনকাম) চাকরিজীবী বা পেনশনের টাকায় চলেন, তারা চরম সংকটে পড়েছেন। খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও এখন এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে, পুরোনো ঋণ তারা শোধ করতে পারছেন না। অনেকে নিয়মিত বাসা ভাড়াও দিতে পারছেন না, বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করছেন সন্তানের শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জালানি তেল ও রান্নার গ্যাসের পর এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ায় বাজার ও অর্থনীতিতে এর একটি মারাত্মক ‘রিপল ইফেক্ট’ বা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি সরাসরি শিল্প উৎপাদন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করবে।”
বিইআরসি-র ১৭ শতাংশ দাম বৃদ্ধি ও আংশিক সংশোধন:
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। রাজধানীর রমনায় কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন এই মূল্যহার ঘোষণা করেন। অবশ্য দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে এর পরদিনই নিম্ন আয়ের মানুষদের কিছুটা স্বস্তি দিতে আবাসিক খাতের দুই শ্রেণির গ্রাহকের জন্য দাম আংশিক সংশোধন করেছে সংস্থাটি। বিইআরসি জানায়, আবাসিকে প্রান্তিক গ্রাহকদের ‘লাইফলাইন’ শ্রেণি (০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী) এবং প্রথম ধাপের (৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী) গ্রাহকদের জন্য বিতরণ সংস্থাগুলোর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আগের দামই বহাল রাখা হয়েছে। তবে এর ওপরের সব শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আকাশচুম্বী হতে যাচ্ছে।
দুর্নীতি ও অপচয়ের দায় জনগণের ওপর:
বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা দেখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে জেঁকে বসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও অপচয় রোধ না করে সাধারণ জনগণের ওপর দামের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া স্পষ্টতই একটি অন্যায় ও জুলুম। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে যে ঘাটতি বাড়ানো হয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ লুণ্ঠন ও পাচার হয়েছে; সেসব অনিয়ম দূর না করে সরকার সহজ পথ বেছে নিয়েছে—জনগণের পকেট কাটা। এর ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগ ব্যয় মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। সরকার মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তার কোনো বাস্তবমুখী বা কৌশলগত পরিকল্পনা আমাদের সামনে দৃশ্যমান নয়।”
হু হু করে বাড়ছে তেল ও এলপিজি-র দাম:
উল্লেখ্য, গত ৩১ মে থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বৃদ্ধি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, গত মার্চ থেকে চলতি জুন মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দফায় দফায় ওঠানামা করে সর্বশেষ ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় ঠেকেছে, যা মার্চে ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে রান্নার সিলিন্ডার প্রতি ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে ৫৪৪ টাকা বা ৪০ দশমিক ৬০ শতাংশ। তদুপরি, খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
ভিশনহীন মধ্যবিত্ত ও দিশেহারা নিম্নবিত্ত:
রাজধানীর কালশী এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জসিব উদ্দিন নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট বেতনের টাকায় পরিবার নিয়ে ঢাকা শহরে টিকে থাকা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত আর নিত্যবাজারের খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসেই ঋণের জালে জড়াতে হচ্ছে। সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী, তার ওপর এখন যদি বিদ্যুৎ বিল বাড়ে, তবে সংসার চালানোই বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু আমাদের বেতন তো বাড়ে না!”
একই সুরে নিজের কষ্টের কথা জানান কদমতলী এলাকার অটোরিকশা চালক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, “সংসারের খরচ সামলাতে অনেক আগেই মাছ-মাংস খাওয়া প্রায় বাদ দিছি। আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করেছি। খরচ বাঁচাতে এখন দূরের ট্রিপে গেলেও বাইরে দুপুরের খাবার খাই না। আর কত কাটছাঁট করলে আমরা বাঁচতে পারব?”
এদিকে রেস্তোরাঁ ও হোটেল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নিত্যপণ্যের পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায় খাবার তৈরির খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, “ব্যয় বাড়ায় আমরা সংকটে আছি। খাবারের দাম বাড়ালে গ্রাহক হারাতে হয়, কারণ মানুষ এখন রেস্তোরাঁয় খাওয়া অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আবার দাম না বাড়ালে লোকসান গুনতে হয়। গ্যাস-বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি আমাদের ব্যবসা খাতকে আরও বড় মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।”


