জাতীয় সরকার প্রশ্নে বিএনপিকে ঘিরে যুগপৎ মিত্রদের ‘অসন্তোষ’: তিন মাসেই দানা বাঁধছে ‘একলা চলো’র শঙ্কা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

May 25, 2026 - 15:22
 0  2
জাতীয় সরকার প্রশ্নে বিএনপিকে ঘিরে যুগপৎ মিত্রদের ‘অসন্তোষ’: তিন মাসেই দানা বাঁধছে ‘একলা চলো’র শঙ্কা
×

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে— তা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও মিত্র দলগুলোর মধ্যে গভীর অসন্তোষ ও ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের একাংশের প্রশ্ন, নির্বাচনের আগে আন্দোলনের যৌথ প্ল্যাটফর্ম থেকে যে জাতীয় সরকারের রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, সরকার গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তার বাস্তব রূপায়ণ কোথায়? মিত্রদের আশঙ্কা, আন্দোলনের সংকটকালীন সময়ে সবাইকে সাথে রাখলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপি এখন অলিখিতভাবে ‘একলা চলো’ নীতিতেই হাঁটছে।

​উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৯ মার্চ লন্ডনে এক আলোচনা সভায় বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন— “আমরা নির্বাচন চাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। নির্বাচনে যারা জিতবে, যারা জিতবে না কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে থাকবে... সকলকে একসাথে নিয়ে আমরা জাতীয় সরকার গঠন করব।” চার বছর পর নতুন সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতিকে ঘিরেই এখন হিসাব মেলাচ্ছেন মিত্ররা।

ঝুঁকি সমান হলেও অংশীদারত্বে বৈষম্য:

যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের প্রধান ক্ষোভ হলো, দীর্ঘ রাজপথের আন্দোলনে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সব দল সমান ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছিল। কিন্তু সরকার গঠনে সেই ত্যাগ ও অংশীদারত্বের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। বর্তমানে ৪৯ সদস্যের বিশাল মন্ত্রিসভা এবং আরও ১০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা মিলিয়ে ৫৯ সদস্যের সরকারে বিএনপির বাইরের মিত্রদের মধ্য থেকে মাত্র দুজনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল জায়গায় শরিকদের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি বা মূল্যায়ন নেই।

​এমনকি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিএনপি শরিকদের সাথে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা করেনি। সংসদের উচ্চকক্ষ (Upper House) গঠন করা হবে কি না, আর করা হলেও সেখানে শরিকদের কোনো রাজনৈতিক অংশীদারত্ব থাকবে কি না— তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

পৃথিবীতে কোনো সমর্থনই শর্তহীন নয়: সাইফুল হক

যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিএনপির যুগপৎ জোটের দুই-তিনজন শরিক নেতা বর্তমানে সংসদে রয়েছেন এবং দুজনকে প্রতিমন্ত্রীও করা হয়েছে। তবে বিএনপির মূল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করলে বাস্তবে কোনো ‘জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়নি। আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি এখন গুরুত্বসহকারে ভাবছে— এমন কোনো লক্ষণ বা সদিচ্ছা আমরা দেখছি না।”

​তিনি কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে বলেন, “আন্দোলনের প্রয়োজন থেকেই হয়তো সে সময় জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দরকার ছিল, তাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন বিএনপি সম্ভবত মনে করছে, যুগপৎ শরিকদের আর কোনো রাজনৈতিক প্রয়োজন নেই। সে কারণে দলটি কিছুটা ‘একলা চলো’ নীতিতেই চলছে। পাখি যেমন মনের আনন্দে গান করে, বিএনপিও হয়তো মনে করছে শরিকরা ক্ষমতার বাইরে থেকেই আজীবন তাদের সমর্থন দিয়ে যাবে। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো রাজনৈতিক সমর্থনই চিরকাল শর্তহীন হতে পারে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, সরকার গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আন্দোলনের পরীক্ষিত সঙ্গীদের সঙ্গে বিএনপির কোনো জীবন্ত যোগাযোগ বা বাস্তবভিত্তিক ‘অর্গানিক এনগেজমেন্ট’ দেখা যাচ্ছে না।”

নির্বাচনেও একা লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা:

যুগপৎ নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতার নামে কিছু আসন ছাড় দেওয়া হলেও শরিকদের জয়ী করে আনার ক্ষেত্রে বিএনপি আন্তরিক ছিল না। উল্টো অনেক আসনেই শরিক দলের মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থীদের স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী গ্রুপ এবং দলটির প্রচ্ছন্ন মদদপুষ্ট 'বিদ্রোহী' প্রার্থীদের মুখোমুখি হয়ে অসম লড়াই করতে হয়েছে।

​প্রসঙ্গত, নির্বাচনে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর, শাহদাত হোসেন সেলিম, আন্দালিব রহমান পার্থ, ববি হাজ্জাজ ও রেজা কিবরিয়া জয়লাভ করলেও সাইফুল হক, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও ড. রেদোয়ান আহমেদের মতো বর্ষীয়ান রাজপথের নেতারা পরাজিত হন। এর মধ্যে ববি হাজ্জাজ (যিনি যুগপতের মূল ধারায় ছিলেন না) বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী মনোনীত হয়েছেন। শরিকদের একাংশের দাবি, বিএনপির আশ্বাসে বিশ্বাস করে নির্বাচনী মাঠে নামায় তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ভিন্নমত ও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অবস্থান:

তবে শরিকদের এই ক্ষোভের মাঝেও ভিন্ন সুর শোনা গেছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদার কণ্ঠে, যিনি নিজে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি বিএনপি জাতীয় সরকারের মূল দর্শন ও কমিটমেন্ট থেকে সরে যায়নি। যোগ্য প্রার্থীদের অনেককেই সরকারে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে যুগপৎ সঙ্গীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

​অন্যদিকে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জাতীয় সরকার মানেই সব দলকে সমানসংখ্যক মন্ত্রণালয় ভাগ করে দেওয়া নয়; বরং সরকার পরিচালনায় বহুমাত্রিক রাজনৈতিক শক্তির মেলবন্ধনই আসল কথা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মন্ত্রী বলেন, “জাতীয় সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চলমান প্রক্রিয়া। শুরুতেই সবকিছু একবারে সম্পন্ন হয় না। ধাপে ধাপে আরও সমন্বয় করা হবে।”

​বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “এটি আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এখতিয়ার। তিনিই বিষয়টি বিবেচনা করবেন। সংসদে হয়তো এটি নিয়ে আগামীতে বিশদ আলোচনা হতে পারে। তবে শরিকদের মূল্যায়ন বা ক্ষোভের ব্যাপারে আমরা দলীয় ফোরামে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা করিনি। তাছাড়া নতুন সরকারের বয়স তো মাত্র তিন মাস যাচ্ছে, তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।”