: ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফার ময়দান: বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলনে পবিত্র হজ আজ

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফার ময়দান। বিশ্বের নানা প্রান্তের ১৫ লাখেরও বেশি মুসলমান সমবেত হয়েছেন পবিত্র হজের মূল রোকন আদায়ে।

May 26, 2026 - 12:47
 0  2
: ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফার ময়দান: বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলনে পবিত্র হজ আজ
×

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি তোমার দরবারে হাজির)— পবিত্র ও আকুল করা এই পুণ্যময় ধ্বনিতে এখন মুখরিত সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফার ময়দান। হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্রতম দিনে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ধবধবে সাদা ইহরাম কাপড়ে আবৃত হয়ে সমবেত হয়েছেন এই পুণ্যভূমিতে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক ধর্মীয় জনসমাগম, যেখানে ভাষা, বর্ণ ও জাতির সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে আল্লাহর সন্তুষ্টির একক লক্ষ্যে শামিল হয়েছেন বিশ্ব মুসলিম।

​সৌদি আরবের রাজকীয় কর্তৃপক্ষের কঠোর নিরাপত্তা ও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় হাজিরা গতকাল মিনা থেকে রওনা হয়ে আজ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আরাফার ময়দানে এসে পৌঁছান। বিপুল এই ভিড় সামলাতে এবং হাজিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে আগে থেকেই নিপুণ ও বিশাল প্রস্তুতি নিয়েছিল দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো।

জাবালে রহমতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লাখো হাজি:

আজ মঙ্গলবার ভোর থেকেই হাজিদের বিশাল কাফেলা ঐতিহাসিক ‘জাবালে রহমত’ বা দয়ার পাহাড়ের দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে। সেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হৃদয়ের সমস্ত আকুতি ঢেলে দিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে গুনাহ মাফ, আত্মশুদ্ধি ও রহমত কামনায় দুই হাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সমবেত মুসলমানরা। এক অপার্থিব, আধ্যাত্মিক ও অভূতপূর্ব ভাবগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি হয় পুরো এলাকা জুড়ে।

​ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, এই জাবালে রহমত বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘেরা স্থান। আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও বেশি আগে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ক্ষণে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়েই মানবজাতির মুক্তির সনদ সংবলিত তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক, ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান ও আবশ্যিক রোকন বা স্তম্ভ, যা ছাড়া কোনোভাবেই হজ পূর্ণাঙ্গ হয় না। পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক প্রান্তর বছরের বাকি সময় সম্পূর্ণ জনশূন্য থাকলেও, হজের এই বিশেষ দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য মুখরিত হয়ে ওঠে বিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলায়।

সৌদি আরবের ব্যাপক চিকিৎসা ও সেবামূলক প্রস্তুতি:

চলতি বছরের তীব্র গরম ও বিশাল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজিদের তাৎক্ষণিক সেবায় পুরো আরাফাত এলাকায় অস্থায়ী হাসপাতাল, আধুনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জরুরি ফার্স্ট এইড ইউনিটগুলো পুরোদমে চালু রাখা হয়েছে। ‘মাউন্ট আরাফাত হাসপাতাল’সহ মাঠ পর্যায়ের ক্লিনিক ও অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় (হাই অ্যালার্ট) রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি বা হিটস্ট্রোকের শিকার রোগীদের দ্রুততম সময়ে বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

​পাশাপাশি সৌদি সিভিল ডিফেন্সের বিশেষ উদ্ধারকারী দলগুলো পাহাড়ের দুর্গম, পাথুরে ও উঁচু স্থানগুলোতে আধুনিক জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম নিয়ে সার্বক্ষণিক মোতায়েন রয়েছে। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় তারা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কাজ করছে।

২০ হাজার আধুনিক লাইট ও সুগম যাতায়াত ব্যবস্থা:

এদিকে সৌদি পৌরসভা ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছরের হজ মৌসুমকে কেন্দ্র করে হজের পবিত্র স্থানগুলোতে বিশেষ আলো ও যোগাযোগ সংস্কারের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। হাজিদের যাতায়াতের পথগুলো সুগম ও আলোকিত করতে প্রায় ৫ হাজার হাই-ভোল্টেজ টাওয়ার ও পোল-এ ২০ হাজারেরও বেশি আধুনিক শক্তি সাশ্রয়ী লাইট স্থাপন করা হয়েছে। মক্কা ও এর আশপাশের পাহাড়ি সড়কগুলোতে প্রায় ২ লাখ লাইটিং ইউনিটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে, যাতে রাতভর হাজিদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়।

​বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই আধ্যাত্মিক কর্মযজ্ঞ ও আবেগঘন জনসমুদ্রের পর, আজ সূর্যাস্তের পরপরই যখন হাজিরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই পরবর্তী রোকন আদায়ের উদ্দেশ্যে মুজদালিফার দিকে রওনা হবেন, তখন আবারও চিরচেনা জনশূন্য ও নীরব রূপে ফিরবে আরাফাত প্রান্তর। আগামী বছরের হজের আগ পর্যন্ত এই পুণ্যভূমি আবারও গভীর অপেক্ষায় প্রহর গুনবে।