সড়কে ঈদযাত্রার প্রথম দিনেই রক্তবন্যা: ৬ জেলায় ঝরল শিশু-নারীসহ ২৮ প্রাণ
ঈদুল আজহার ছুটির প্রথম দিনেই দেশের ৬টি জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু ও নারীসহ অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে সর্বোচ্চ ১৫ জনের মৃত্যু।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির প্রথম দিনেই দেশের সড়ক-মহসড়কগুলোতে এক রক্তক্ষয়ী ও মর্মান্তিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দেশের অন্তত ছয়টি জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু ও নারীসহ ২৮ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও পৈশাচিক ট্রাজেডি ঘটেছে টাঙ্গাইলে, যেখানে একটি নিয়ন্ত্রণহীন রডবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে পড়ে গিয়ে একই সাথে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। ঈদযাত্রার শুরুতেই এমন ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবার ও জেলাগুলোতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিকের মৃত্যু:
মহাসড়ক পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী লোহার রডবোঝাই একটি বড় ট্রাকের ওপর প্রায় ৩০ জন দিনমজুর ও হকার যাত্রী হিসেবে সস্তা ভাড়ায় চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন।
পথিমধ্যে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে গভীর খাদে উল্টে পড়ে যায়। ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন যাত্রী পিষ্ট হয়ে মারা যান। এই ঘটনায় আরও অন্তত ৯ জন গুরুতর আহত হন, যাদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৯ জনই নওগাঁ জেলার একই ইউনিয়নের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
বগুড়ায় দুই পৃথক দুর্ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু:
বগুড়ায় সোমবার পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে দুটি অবুজ শিশুকন্যা রয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শাজাহানপুর উপজেলার ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনানী এলাকায়। রংপুরে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে কর্মরত আনিছুর রহমান (৩৫) ঈদের ছুটিতে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ি পাবনায় যাচ্ছিলেন। পথে একটি দ্রুতগামী অজ্ঞাত যান তাদের ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই বাবা আনিছুর ও তাঁর ৪ বছরের কন্যাসন্তান পুষ্প নিহত হন এবং স্ত্রী গুরুতর আহত হন।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে বিকেলে কাহালু উপজেলার কাজিপাড়া এলাকায়। সেখানে একটি যাত্রীবাহী বাসের সাথে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি ধাক্কায় জেমি আকতার ও তাঁর কন্যাসন্তান তনু আকতার ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
অন্যান্য জেলার দুর্ঘটনার চিত্র:
ছয় জেলার বাকি স্থানগুলোতেও ছিল মৃত্যুর মিছিল—
কিশোরগঞ্জ: জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে শিশুসহ ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
সিরাগঞ্জ: জেলার শাহজাদপুর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও স্থানীয় যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও নোয়াখালী: এই তিন জেলায় বেপরোয়া গতির কারণে সংঘটিত পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ৩ জন আরোহী ও পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন।
হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটির কারণে মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের টিমগুলো দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করেছে এবং নিহতদের লাশ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে।


