ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়: সান মারিনোকে হারিয়ে রূপকথা হামজা-তপুদের

ইউরোপের মাটিতে স্বাগতিক সান মারিনোকে ১-২ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। তপু বর্মণের জোড়া গোল।

Jun 6, 2026 - 10:04
 0  3
ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়: সান মারিনোকে হারিয়ে রূপকথা হামজা-তপুদের
×

অস্ট্রিয়ান রেফারি ওল্টারম্যানের ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই এক অবিশ্বাস্য ও গৌরবময় ইতিহাস রচিত হলো ইউরোপের বুকে। বাংলাদেশের ফুটবল ডাগআউট থেকে ফুটবলার, কোচিং স্টাফ ও অফিশিয়ালরা বাঁধভাঙা উল্লাসে মাঠের ভেতরে দৌড়ে প্রবেশ করলেন। মাঠে থাকা লাল-সবুজের যোদ্ধারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে মেতে উঠলেন আনন্দ উদযাপনে। দূর পরবাসে দেশের এমন রূপকথার জয়ে সান মারিনো জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসী সমর্থক উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন। স্বাগতিক সান মারিনোকে ১-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে ইউরোপের মাটিতে এক ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল।

​ফুটবল পরাশক্তি ইতালির ভেতরেই অবস্থিত ক্ষুদ্র এক দেশ সান মারিনো। যদিও তারা ফিফা র‍্যাংকিংয়ে তলানির দল, কিন্তু ইউরোপের দেশ হওয়ায় নিয়মিতই তাদের জার্মানি, স্পেন, ইতালি বা ফ্রান্সের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে লড়তে হয়। ফলে ঘরের মাঠে তাদের শক্তি ও অভিজ্ঞতা কোনো অংশেই কম ছিল না। আর তাই সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের এই জয় দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন স্বর্ণালি অধ্যায় যোগ করল। কারণ, ইউরোপের মাটিতে কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত করে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এর আগে বাংলাদেশ ২০০০ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেললেও তা জিততে পারেনি এবং ২০০১ সালে ভারতের মাটিতে ইউরোপের দল বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেছিল।

​ম্যাচের নায়ক তপু বর্মণের ‘জোড়া হেড’:

আজকের এই অবিস্মরণীয় ও রূপকথার জয়ের একমাত্র নায়ক দেশের অভিজ্ঞ রক্ষণভাগের তারকা তপু বর্মণ। ম্যাচের দুই অর্ধে দুটি দর্শনীয় গোলই তিনি করেছেন নিজের চেনা টেকনিক 'হেডে'। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার পর তপুর হাতেই ছিল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। অধিনায়কের বাহুবন্ধনী পরে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ইউরোপের মাটিতে এই প্রথম ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছেন এই জাঁদরেল ডিফেন্ডার।

ম্যাচের প্রথমার্ধ ও রোমাঞ্চকর লড়াই:

খেলার শুরুতে ইতালির রোম, ভেনিসসহ বিভিন্ন শহর থেকে আসা হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি সমর্থকদের উপস্থিতিতে গ্যালারি প্রায় পুরোটাই লাল-সবুজ রঙে সেজেছিল। ফলে অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও স্টেডিয়ামে ছিল বাংলাদেশের হোম ম্যাচের এক দারুণ আবহ। এমন মনস্তাত্ত্বিক সুবিধার মাঝেও বাংলাদেশের শুরুটা খানিকটা নড়বড়ে ছিল। ঘরের মাঠে বল দখল ও আক্রমণে প্রথম ১০ মিনিট আধিপত্য দেখায় সান মারিনো। তবে ম্যাচের বয়স বাড়ার সাথে সাথে গুছিয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

​ম্যাচের ১৯ মিনিটে প্রথম কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় বাংলাদেশ। সদ্য বাংলাদেশ দলে যোগ দেওয়া বিশ্বখ্যাত তারকা হামজা চৌধুরীর নিখুঁত ফ্রি-কিক থেকে শেখ মোরসালিন ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সে চমৎকার এক ক্রস বাড়ান। সেখানে ওতপেতে থাকা ডিফেন্ডার তপু বর্মণ বুলেট গতির হেডে সান মারিনোর জালে বল জড়ান (১-০)। উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।

​তবে বাংলাদেশের এই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১৪ মিনিট। ৩৩ মিনিটে গোলদাতা তপু বর্মণেরই এক ডিফেন্ডিং ভুলে ম্যাচে সমতা ফেরায় স্বাগতিকরা। সান মারিনোর ফরোয়ার্ড বেরাদিকে বক্সের লাইনে ফাইনাল চার্জ করলেও তাকে সফলভাবে রুখতে ব্যর্থ হন তপু। বেরাদি চতুরতার সাথে কাটব্যাক করলে বক্সের ভেতর ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে নিখুঁত শটে গোল করেন নিকোলাস। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমা ডান দিকে দারুণ ডাইভ দিলেও বল তাঁর হাতে লেগে জালে প্রবেশ করলে ম্যাচ ১-১ সমতায় ফেরে। বিরতির ঠিক আগে বাংলাদেশ আবার এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল, তবে শেখ মোরসালিনের পাস থেকে গোলরক্ষককে একা পেয়েও পোস্টের ওপর দিয়ে বল মারেন সাদ উদ্দিন।

দ্বিতীয়ার্ধে কোচের চাল ও জয়সূচক গোল:

প্রথমার্ধে ১-১ সমতা থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কৌশলী পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশের হেড কোচ থমাস ডুলি। তিনি মাঠে নামান তরুণ সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানা জুনিয়রকে। জায়ান ও সামিত মাঠে নামার পর মাঝমাঠে বাংলাদেশের খেলার গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর মাঝেই ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের একটি দুর্দান্ত শট সাইড পোস্টে লেগে ফেরত আসলে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।

​ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট আগে ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষকে উইঙ্গার হিসেবে নামিয়ে মাস্টারস্ট্রোক খেলেন কোচ ডুলি। আর এই পরিবর্তনের সুবাদেই আসে কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোল। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে পুনরায় হামজা চৌধুরীর চমৎকার ফ্রি-কিক থেকে বক্সে ভলি নেন বিশ্বনাথ ঘোষ। সেই মুহূর্তে তপু বর্মণ মাটিতে পড়ে গেলেও দ্রুত ওঠার সময় বলটি অলৌকিকভাবে তাঁর মাথায় লেগে সান মারিনোর জালে জড়িয়ে যায় (২-১)।

​চতুর্থ রেফারি অতিরিক্ত ৪ মিনিট ইনজুরি সময় দিলে শেষ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালায় সান মারিনো। ম্যাচের একদম শেষ মিনিটে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাত ফস্কে বল গোললাইন ক্রস করার উপক্রম হলেও, বলটি দাগ পুরোপুরি অতিক্রম না করায় ভাগ্যবশত গোল হজম থেকে রক্ষা পায় বাংলাদেশ। শেষ ২ মিনিট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বল নিয়ন্ত্রণে রেখে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে লাল-সবুজের দল। ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের এই জয় দেশের ফুটবলের পুনর্জাগরণের নতুন বার্তা দিয়ে গেল।