বিজেপি সরকারের কড়াকড়ি ও আইনি জটিলতা এড়াতে ঈদে গরু কোরবানি না করার সিদ্ধান্ত আসামের মুসলিমদের
ভারতের আসামে বিজেপি সরকারের কঠোর গবাদিপশু সংরক্ষণ আইনের মুখে ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সমাজের বিভিন্ন ঈদগাহ কমিটি।
ভারতের আসাম রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারের কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় (কোরবানির ঈদ) গরু কোরবানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সমাজ। রাজ্যের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী ঈদগাহ কমিটি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি এবারের ঈদে গরু কোরবানি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার এবং প্রচলিত আইন মেনে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে।
আসন্ন ঈদুল আজহার আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরাসরি হুঁশিয়ারি ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির পরই রাজ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর ঈদ কমিটিগুলো এই কৌশলগত ও শান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।
আইনি জটিলতা ও শাস্তির খড়্গ এড়ানোর চেষ্টা:
গত শনিবার (২৩ মে) রাজ্যের অন্যতম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ধুবড়ির ‘ধুবড়ি টাউন ঈদগাহ কমিটি’র পক্ষ থেকে এক জরুরি বিবৃতিতে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, আইনসম্মত এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পবিত্র ঈদ উদযাপনের অনুরোধ জানানো হয়।
বিবৃতিতে কমিটি স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দেয় যে, ‘আসাম গবাদিপশু সংরক্ষণ আইন’ (Assam Cattle Preservation Act) অনুযায়ী বর্তমানে রাজ্যে গরু জবাইয়ের ওপর সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি রয়েছে। এই আইন সামান্যতম অমান্য করলেও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বড় অংকের অর্থদণ্ডসহ কঠোর আইনি ও পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হতে হবে। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর আইনি জটিলতা বা উগ্রবাদীদের হেনস্তার সুযোগ না দিতেই এবার ঈদে গরু কোরবানি না করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঈদগাহ কমিটির সভাপতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, "আইনি সুরক্ষার স্বার্থে আমরা এবার ঈদে গরু কোরবানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সকল মুসলিম ভাইদেরও এই অনুরোধ করেছি। ইসলাম ধর্মে কোরবানি হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে গরুই দিতে হবে—এমন কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বা নিয়ম নেই; ছাগল, দুম্বা বা অন্য হালাল পশু দিয়েও কোরবানি সম্পন্ন করা যায়। আমাদের ধর্মীয় আচারের কারণে অন্য কোনো ধর্মের মানুষ বা আইন যেন লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই খেয়াল রাখা উচিত।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ারেও কঠোর মানা:
বিজেপি সরকারের কঠোর গোয়েন্দা ও সাইবার নজরদারির মধ্যে ঈদ কমিটিগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আরও কিছু জরুরি নির্দেশনাবলী জারি করেছে। কোরবানি যেন কোনোভাবেই প্রকাশ্য স্থানে না দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট বা সরকার নির্ধারিত ঘেরা জায়গায় দেওয়া হয় এবং চারপাশের পরিচ্ছন্নতা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়, সে বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব) কোরবানির পশুর ছবি বা রক্তমাখা ছবি-ভিডিও ছড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কমিটি সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের পোস্টকে কেন্দ্র করে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ উস্কানি তৈরি করতে পারে এবং তা রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অজুহাত হিসেবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাধুবাদ:
এদিকে মুসলিম কমিটিগুলোর এমন কৌশলগত ও সংযত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও কট্টর বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "অন্যান্য কমিটির ধারাবাহিকতায় ধুবড়ি টাউন ঈদগাহ কমিটিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং দেশের আইন মেনে গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। আমি রাজ্যের সব ঈদ কমিটিকে এগিয়ে আসার এবং এবারের ঈদকে ‘গরু কোরবানি মুক্ত’ করার আহ্বান জানাচ্ছি।"
ধুবড়ির পাশাপাশি রাজ্যের হোজাই টাউন ঈদগাহ কবরস্থান কমিটিসহ অন্যান্য জেলার স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনগুলোও মুসলিম বাসিন্দাদের সরকারি নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলার এবং কোরবানির সময় সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।


