এআই ক্যামেরায় মামলার ভয় দেখিয়ে প্রতারণা

রাজধানীতে ডিএমপির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ট্রাফিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় প্রতারক চক্র। বিআরটিএর নামে জাল লিংক পাঠিয়ে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা।

May 25, 2026 - 10:58
 0  4
এআই ক্যামেরায় মামলার ভয় দেখিয়ে প্রতারণা
×

ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সম্প্রতি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করেছে, সেটিকে পুঁজি করে মাঠে নেমেছে একটি সুসংগঠিত সাইবার অপরাধী চক্র। যানবাহনের মালিকদের মোবাইলে বিদেশি নম্বর থেকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়ো এসএমএস (SMS) পাঠিয়ে অভিনব কায়দায় ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। এআই মামলার নামে বিআরটিএর লোগো সংবলিত ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক পাঠিয়ে অনলাইন পেমেন্ট নেওয়ার মাধ্যমে এই চতুর প্রতারণা চালানো হচ্ছে।

​গত রোববার (২৪ মে) থেকে রাজধানীর অসংখ্য গাড়ি মালিক ও ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ট্রাফিক অ্যালার্ট গ্রুপ এবং নিজেদের টাইমলাইনে এমন ভুয়া এসএমএস পাওয়ার স্ক্রিনশট শেয়ার করে সত্যতা জানতে চাইলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

প্রতারণার ধরন ও ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা:

রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা ইয়াসিন পাটোয়ারী প্রতারকদের পাঠানো এমনই একটি খুদে বার্তার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, “আমার ফোনে একটি এসএমএস এসেছে। এটা কি সত্যিকারের এআই মামলা, নাকি কোনো স্ক্যাম?” প্রতারকদের পাঠানো সেই জালিয়াতিপূর্ণ বার্তায় লেখা ছিল—

​“[বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ] জরিমানা পরিশোধ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি। জরিমানা নম্বর: ২০২৬-বিডি-৫৬১২৩০৪৩টি। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (ক্যামেরা নম্বর: টিআর-৭৭২) অনুযায়ী, আপনার যানবাহনটি নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন করেছে। অনুগ্রহ করে ২৪ মে মধ্যরাতের পূর্বে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করুন: https://bspbrtcar-govbd.online।”

​ভুক্তভোগী ইয়াসিন পাটোয়ারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার স্বয়ংক্রিয় জরিমানা আদায়ের সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিটি সাধারণ নাগরিকদের স্পষ্টভাবে না জানিয়ে এই প্রকল্প চালু করায় চালকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। সরকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রচার না করায় অসাধু চক্র এই সুযোগ নিচ্ছে।"

বিদেশি নম্বর ও ভুয়া ডোমেইন: সাইবার বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

এই বিপজ্জনক ফিশিং স্ক্যামের বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তানভীর হাসান জোহা বলেন, “প্রতারকদের পাঠানো এই মেসেজটি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি চরম উদ্বেগজনক বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, বার্তাটি এসেছে একটি বিদেশি নম্বর (+63) থেকে, যা বাংলাদেশের সরকারি কোনো দপ্তরের যোগাযোগ পদ্ধতি নয়। দ্বিতীয়ত, সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটগুলোতে ডোমেইন হিসেবে সর্বদা ‘.gov.bd’ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতারকরা ‘.online’ বা ‘.icu’ ডোমেইনের আগে ‘govbd’ শব্দ জোড়া দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে; যা একটি পরিচিত ফিশিং কৌশল।”

​তিনি আরও যোগ করেন, “বার্তায় ‘জাতীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্তি’ বা ‘আইনানুগ শাস্তি’র মতো ভয়ভীতি দেখিয়ে জরুরি চাপ (Urgency Tactic) প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত লিংকে ক্লিক করে। এই লিংকে ঢুকে কার্ডের তথ্য বা ওটিপি (OTP) দিলেই মুহূর্তের মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড খালি হয়ে যাবে।”

বিআরটিএ ও ডিএমপির স্পষ্ট বার্তা:

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা নোবেল দে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, "সড়ক পরিবহন সচিব ও বিআরটিএ (BRTA) চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। বিআরটিএ-র পক্ষ থেকে কোনো এআই মামলা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং বিআরটিএ এই ধরনের কোনো মামলার পেমেন্টও নিচ্ছে না। এটি স্পষ্টতই একটি জঘন্য প্রতারণা।"

​অন্যদিকে, ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন কালবেলাকে বলেন, “এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ থেকে এখন পর্যন্ত কারও মোবাইল ফোনে কোনো ডিজিটাল মেসেজ বা লিংকের বার্তা পাঠানো হয়নি। এআই ক্যামেরার মামলার যাবতীয় নথিপত্র সরাসরি ডাকযোগে (Post Office) মালিকের বাসাবাড়ির ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। যার গাড়ির বিরুদ্ধে প্রকৃত মামলা হবে, তিনি সরাসরি সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের অফিসে সশরীরে হাজির হয়ে সরকারি রসিদের মাধ্যমে জরিমানা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করবেন। কোনো অনলাইন লিংকে টাকা দেবেন না।” ডিএমপি নাগরিকদের এই ধরনের কোনো লিংকে ক্লিক না করার এবং আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর অনুরোধ জানিয়েছে।