জামায়াত-এনসিপি ঠেকাতে মাঠে ফেরার ছক আ.লীগের: বিভেদের সুযোগে তৃণমূল গোছানোর গোপন মিশন
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্রমবর্ধমান আধিপত্য রুখতে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে মাঠের রাজনীতিতে ফেরার গোপন ছক কষছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে সংসদীয় আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাঠের রাজনীতিতে ফেরার জন্য ব্যাকডোর ডিপ্লোম্যাসি ও গোপন কৌশলগত ছক কষছে। দলটির নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং রাজপথের অন্যতম উদীয়মান শক্তি ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও প্রভাবকে যেকোনো মূল্যে ঠেকানো।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের ধারণা— জামায়াত ও এনসিপির অতি-রাজনৈতিক হঠকারিতা এবং শাসনতান্ত্রিক আধিপত্যের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে। এই মাঠের শূন্যতা ও সুপ্ত জনক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই তারা পুনর্বাসিত হতে চায়।
মিত্রদের দূরত্ব ও আওয়ামী লীগের ‘তৃণমূল মিশন’:
সম্প্রতি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম প্রধান অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতের নীতিগত ‘মনোমালিন্য’ ও অভ্যন্তরীণ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এই রাজনৈতিক বিভেদকে একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। সূত্র মতে, মাঠের এই শূন্যতা ও কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে প্রকাশ্য কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরার জন্য দলটির দায়িত্বশীল নেতারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের তলে তলে সংগঠিত হওয়ার এবং প্রস্তুতি নেওয়ার গোপন নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন।
তবে আওয়ামী লীগ রাজপথে ফেরার সামান্যতম চেষ্টা করলে বা তাদের পুনর্বাসনের যেকোনো প্রক্রিয়াকে আমজনতাকে সাথে নিয়ে কঠোরভাবে প্রতিহত করার যৌথ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে জামায়াত ও এনসিপি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলছে— ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক ফেরার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই, কারণ দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও সিংহভাগ বড় নেতা হয় কারাগারে, নয়তো দেশ ছেড়ে বিদেশে পলাতক।
আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, জামায়াত-এনসিপিকে ঠেকানোর পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান বিএনপি সরকারকে হুট করে বড় ধরনের বেকায়দায় বা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে— এমন কোনো উগ্র বা হঠকারী কর্মসূচিতে যাওয়ার আপাতত কোনো চিন্তা দলটির নেই। তাদের মূল রণকৌশল হলো, প্রথমে মাঠের নেতাকর্মীদের নামিয়ে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। পুলিশ কতটা কঠোর বা সহনশীল আচরণ করে— তার ওপর ভিত্তি করেই দলটির আগামী দিনের চূড়ান্ত কর্মকৌশল নির্ধারিত হবে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ফেরা কি অসম্ভব?:
চলতি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান মুখ বা কেন্দ্রবিন্দু করে পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার অবাস্তব চেষ্টা চালায়, তবে তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী ও অসম্ভব এক মিশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো— শেখ হাসিনার পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি ফেরা আর কোনোদিনই সম্ভব নয়। ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে যেভাবে ক্ষমতার পতন ঘটিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, সেই আগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তিনি জনগণ বা নিজের সাধারণ নেতাকর্মীদের কাছেও আর ফিরে পাবেন না। তাকে সামনে রেখে শুরু করার কথা ভাবলে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ভুল করবে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সম্পূর্ণ নতুন ও বিতর্কহীন নেতৃত্ব নিয়ে তাদের শূন্য থেকে শুরু করার কথা ভাবতে হবে। তবে কৌশলের অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে তারা যে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, তা স্পষ্ট।”
অবশ্য দলটির এমন অবরুদ্ধ অবস্থার বিষয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল দাবি করেন, “আওয়ামী লীগকে রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন থেকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখতে অতীতেও বারবার দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বড় বড় চক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু জনগণের শক্তির কাছে তারা ব্যর্থ হয়েছে। যারা গণতন্ত্রবিরোধী, তারাই চক্রান্ত করে আওয়ামী লীগকে মাঠের বাইরে রাখতে চায়।”
দেশজুড়ে বাড়ছে ঝটিকা মিছিল ও কারামুক্তি:
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের পর থেকেই মূলত মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হওয়ার জন্য মরণকামড় দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার নিষিদ্ধ অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ। গত মে ও চলতি জুন মাসেও রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ভোররাত বা সাতসকালে আচমকা ‘ঝটিকা মিছিল’ ও শোডাউন দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, সময়ের সাথে সাথে এই ঝটিকা মিছিলগুলোতে নেতা-কর্মীদের ঝটিকা উপস্থিতি কিছুটা বাড়ছে। অবশ্য এই সমস্ত ঝটিকা মিছিল ও রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অপরাধে দেশজুড়ে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে, অতি সম্প্রতি কারাগার থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নারী নেত্রী— জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও কিছু মামলায় জামিন পেয়েছেন। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক মাঝারি সারির নেতা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে 'জুলাই সনদ' বা বিভিন্ন নীতিগত ইস্যুতে তৈরি হওয়া প্রকাশ্য দূরত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই আওয়ামী লীগকে ধীরে ধীরে পর্দার আড়ালে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের ‘সব দল’ বক্তব্য ও নতুন ধোঁয়াশা:
আওয়ামী লীগের এই কৌশলী তৎপরতার মাঝেই নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন খোদ বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের এক নাগরিক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেন, “দেশে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু, সহনশীল ও উদারপন্থী রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও জনগণের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
বিএনপি মহাসচিবের এই ‘সব দল’ (All Parties) শব্দের ব্যবহারের পর জামায়াত, এনসিপি ও সুশীল সমাজের ভেতর তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— সব দলের মধ্যে কি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও অন্তর্ভুক্ত?
এই বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “বিএনপি রাজনৈতিক কৌশলের কারণে মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগকে স্পেস দেওয়ার কথা বলে থাকে। কিন্তু জুলাই গণহত্যার দায়ে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ তার নৈতিক ও আইনি অধিকার হারিয়েছে। গণহত্যার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত খুনিদের রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। ৫-১০ জন লোক নিয়ে শেষ রাতে লুকোচুরি করে ঝটিকা মিছিল করে কোনো লাভ হবে না। তারা দেশে পুনরায় নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করলে ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল দল মিলে কঠোরহস্তে দমন করবে।”
অনুরূপভাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “বিএনপি ভাশুরের নাম নিতে লজ্জা পাচ্ছে। সরাসরি আওয়ামী লীগকে স্পেস দিতে চাইলে বা ফেরাতে চাইলে তা অকপটে স্বীকার করলেই হয়। পার্লামেন্টে আইন পাস করে যাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তারা কীভাবে ঝটিকা কর্মসূচি পালন করে তা দেখার দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারের। ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন জনগণ চায় না এবং জামায়াতও জনগণের সাথে রাজপথে আছে।”
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বিমুখী অবস্থান ও ব্যাখ্যা:
বিএনপির নির্ভরযোগ্য দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্পষ্ট দুটি ধারা বা মতাদর্শ রয়েছে। একটি বড় অংশ মনে করে— আওয়ামী লীগকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিলে তা ভবিষ্যতে বিএনপির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হবে, কারণ অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবন দিয়েছিলেন এবং গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ তার নির্মম প্রতিদান দিয়েছে। অন্য অংশটি মনে করে— বহুদলীয় গণতন্ত্রে একটি বড় শক্তিকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা অবরুদ্ধ রাখলে দেশে তৃতীয় কোনো অরাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি বিপজ্জনক।
তবে বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “বিএনপি মহাসচিব মূলত দেশের প্রচলিত আইনে বৈধ, গণতান্ত্রিক ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীন কার্যক্রমের অধিকারের কথা বলেছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের নাম আসার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই, কারণ তারা রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ এবং তাদের অপরাধের কারণে তারা আজ ফেরারি। সব দলের তালিকায় আওয়ামী লীগ নেই।”


