সবার চোখের সামনে কিডনি কেনাবেচার জমজমাট হাট: মানবপাচার ও অঙ্গ বাণিজ্যের ভয়াবহ রূপ
‘ইমার্জেন্সি রক্ত লাগবে’— এমন সাংকেতিক বিজ্ঞাপনের আড়ালে ফেসবুকে চলছে কিডনি কেনাবেচার অবৈধ বাণিজ্য। আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ রক্ত লাগবে, পাসপোর্ট থাকতে হবে’— এমন সব পোস্ট দেখে সাধারণ রক্তদান মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ অপরাধ। এটি মূলত মানব অঙ্গ বা কিডনি কেনাবেচার গোপন বিজ্ঞাপন। আইনি নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে ফেসবুকের অর্ধশতাধিক ক্লোজড গ্রুপে প্রতিদিন বসছে কিডনি কেনাবেচার জমজমাট হাট।
কিডনি পাচার চক্রের তিন স্তরের সুসংগঠিত কাঠামো
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই আন্তর্জাতিক চক্রটি মূলত তিনটি সুসংগঠিত স্তরে কাজ করে:
১. এজেন্ট (মাঠকর্মী): প্রথম স্তরে থাকে এলাকাভিত্তিক ও ফেসবুকভিত্তিক এজেন্টরা। তারা অভাবগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত মানুষকে ৪-৫ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করায়।
২. ফিক্সার্স (সমন্বয়কারী): দ্বিতীয় স্তরে ফিক্সার্সরা দাতা ও গ্রহীতার পাসপোর্ট, ভিসা ও করাচি যাওয়ার টিকেট প্রসেসিং করে। তারা ভুক্তভোগীর মূল এনআইডি কার্ড রেখে দেয় যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।
৩. রানার্স (পাকিস্তান শাখা): তৃতীয় স্তরে পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে রানার্সরা কিডনিদাতাদের রিসিভ করে গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়।
মূল্য এবং বৈষম্য: গ্রহীতা দেয় কোটি, দাতা পায় সামান্য
চক্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে গ্রহীতাকে একটি কিডনির জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। অথচ জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নিজের অঙ্গ দান করা দাতার ভাগ্যে জোটে মাত্র ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। বাকি বিপুল পরিমাণ অর্থ পকেটে তোলে দেশি-বিদেশি দালাল ও সিন্ডিকেটের ‘কিংপিন’রা।
প্রশাসনিক যোগসাজশ ও তদন্তে অচলাবস্থা
অনুসন্ধানে বিমানবন্দরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন এসআই-এর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যিনি এক ভুক্তভোগীকে নিজের ‘ভাই’ পরিচয় দিয়ে বোর্ডিং পাস নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিলেন। এছাড়া, মামলার দুর্বল তদন্ত এবং মূল হোতাদের আড়ালে রাখার চেষ্টার কারণে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশের সাইবার টিম মনিটরিংয়ের কথা বললেও ওপেন গ্রুপগুলোতে প্রকাশ্যেই চলছে এই বাণিজ্য।
পাকিস্তান এখন মূল ট্রানজিট
আগে ভারতের বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রতিস্থাপন হলেও বর্তমানে কূটনৈতিক কারণে ভিসা জটিলতায় চক্রটি পাকিস্তানের করাচিকে বেছে নিয়েছে। করাচির ডা. জিয়াউদ্দিন হাসপাতাল, নিউ হরাইজন কেয়ার হসপিটালসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্লিনিকে এই অবৈধ প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়।
আইনি অবস্থান ও বিশেষজ্ঞের মত
‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের বাইরে অঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অপরাধ সমাজবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, "আর্থিক অনটন ও ঋণের বোঝা মানুষকে এই মরণফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। এটি বন্ধে প্রান্তিক পর্যায়ে জনসচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।"
এই ভয়াবহ চক্র থেকে বাঁচতে ঋণের তাড়নায় বা প্রলোভনে পড়ে নিজের মূল্যবান অঙ্গ দান না করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


