দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটে মেগা করছাড়: দাম কমবে ও বাড়বে যেসব পণ্যের

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় ভ্যাট, শুল্ক ও করছাড়ের মেগা সুবিধা আসছে। জেনে নিন কোন কোন পণ্যের দাম কমছে এবং কোনগুলোর দাম বাড়ছে।

Jun 9, 2026 - 10:24
 0  4
দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটে মেগা করছাড়: দাম কমবে ও বাড়বে যেসব পণ্যের
×

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় করছাড়ের বড় ধরনের বাড়তি সুবিধা দিতে যাচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে শুধু কর অব্যাহতিই নয়, বরং ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) ও পণ্য আমদানির শুল্ক-করেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হতে পারে। মূলত স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতেই এই মেগা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

​বাজেট পরিকল্পনায় ইলেকট্রনিক্স খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, আগামী অর্থবছর থেকে বিভিন্ন খাতের করছাড় বা কর অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই নীতিমালার কারণে দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের দাম কমলেও, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত বেশ কিছু বিদেশি ও বিলাসী পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে, যার ফলে সেগুলোর দাম বাড়বে।

যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

​১. দেশে উৎপাদিত টিভি, এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য

​দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও হাউজহোল্ড পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ককর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে, যার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। বর্তমানে ২২টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান থাকা এই খাতটিকে সরকার রপ্তানিমুখী করতে চায়।

২. কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ভ্যাট-কর মুক্তি

​ডিজিটাল মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় সুখবর আসছে। তাদের ওপর থাকা বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও ৭ শতাংশ আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হতে পারে।

৩. জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী

​ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে। এছাড়া, হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট এবং ক্যান্সারের নয় ধরনের ওষুধ আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হলে প্রতিবারে ডায়ালাইসিস খরচ প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমবে।

​৪. নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য

​বাজার দর সহনীয় রাখতে মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য যেমন— ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি পণ্যের উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে একযোগে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। আমদানি করা শিশুখাদ্যের দাম কমাতেও শুল্ক-করে ছাড় আসতে পারে।

৫. সৌর প্যানেল, ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ি

​সৌর বিদ্যুৎ: পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় ২০৩০ সাল এবং সৌর বিদ্যুতের সব উপকরণ আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ রেয়াত দেওয়া হতে পারে।

​ই-কার ও ই-বাইক: স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হবে। ইলেকট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে কিলোওয়াট অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে। এছাড়া, ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (आरडी) প্রত্যাহার হতে পারে।

৬. কম্পিউটার ও মোবাইল সামগ্রী

​দেশে তৈরি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইলের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। কম্পিউটার ও মনিটর আমদানির যন্ত্রাংশে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

৭. সোনা ও মোবাইল সিম

​স্বর্ণালঙ্কার: স্বর্ণ বিক্রিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে সুনির্দিষ্ট হারে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে। এছাড়া এই খাতের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে।

​মোবাইল সিম: মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর বাতিল হতে পারে, ফলে সিমের দাম কমবে।

৮. অন্যান্য সেবা ও পণ্য

​বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার হচ্ছে।

​লোশন, ফেস ক্রিম ও ফেসওয়াশের আমদানি শুল্ক কেজি প্রতি ২০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার এবং লিপস্টিকের শুল্ক ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার করা হতে পারে।

​বাদ্যযন্ত্র ও এটিএম কার্ড তৈরির কাঁচামাল আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার হতে পারে।

​মৃতদেহ সংরক্ষণের মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

​যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

​দেশীয় শিল্প ও খামারিদের সুরক্ষা দেওয়া এবং তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার অংশ হিসেবে বেশ কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বাড়ানো হচ্ছে:

​কাজু বাদাম ও হিমায়িত মাছ: দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাজু বাদাম চাষ শুরু হওয়ায় আমদানি করা কাজু বাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, পাঙাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং বিদেশি দামি হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হতে পারে।

​তামাক ও সিগারেট: সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়তে পারে। সিগারেটের ফিল্টার তৈরির পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ, নিকোটিনে ৩৫০ শতাংশ এবং নিকোটিন পাউচে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হতে পারে। খুচরা ব্যবসায়ীদের হাজারে ২ টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে।

​দেশি ও বিদেশি মদ: রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদে প্রতি লিটারে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি মদের দামও শুল্কায়নের কারণে বাড়তে পারে।

​এমএস রড: দেশে মাইল্ড স্টিল (এমএস) এবং এ জাতীয় পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে, যার ফলে রডের দাম বাড়বে।

​আমদানিকৃত আইটি সামগ্রী: দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাইরে থেকে আমদানি করা ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও প্রিন্টারের ওপর শুল্ক বাড়ানো হতে পারে।