পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়: সোহেল ও তার স্ত্রীর ফাঁসি'র আদেশ
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর নৃসংশভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে মামলার প্রধান খলনায়ক ও খুনি সোহেল রানা এবং অপরাধের সহযোগী হিসেবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার— উভয়কেই সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড’ দিয়েছেন আদালত। ফাঁসির আদেশের পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হয়েছে।
আজ রবিবার (৭ জুন) বেলা ঠিক ১১টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার ‘মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল’-এর বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত আসামিদের কাঠগড়ায় উপস্থিত রেখে এই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত বিশেষ আইনজীবী (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু রায়ের এই সুনির্দিষ্ট তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। দেশের বিচারিক ইতিহাসে মাত্র ৪ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো ক্লু-লেস মার্ডার কেসের বিচারকাজ শেষ করে ফাঁসির রায় দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
১৬৪ ধারায় খুনির লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি:
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতারের পর ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হয়। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাদকাসক্ত সোহেল রানা ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বলে:
“আমি ওই বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকি এবং নিয়মিত নেশা করি। ঘটনার দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের পুরুষ মানুষেরা কাজে বের হয়ে গেলে ৮ বছরের শিশু রামিসা তাদের ঘরের বাইরে আসে। তখন আমি তাকে ফুসলিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিই। সে ভেতরে আসামাত্র আমি তাকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করি। মেয়েটি ভয়ে চিৎকার দিলে আমি তার মুখ চেপে ধরি এবং গলার ওড়না দিয়ে মুখ শক্ত করে বেঁধে বাথরুমেই তাকে ধর্ষণ করি। ধর্ষণের একপর্যায়ে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে আমি ভাবি সে মারা গেছে। এরপর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে ধারালো ছুরি এনে বাথরুমের ভেতরেই তার মাথা কেটে দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করি। এরপর হাত কেটে টুকরো করার চেষ্টা করছিলাম। ঠিক তখনই রামিসার মা বাইরে খোঁজাখুঁজি করতে করতে আমাদের বন্ধ দরজার সামনে মেয়ের জুতো দেখে অনবরত ডাকাডাকি শুরু করেন। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। পরে ঘরের পেছনের জানালায় গিয়ে সেলাইরেঞ্জ দিয়ে লোহার গ্রিল কেটে বাইরে পালিয়ে যাই।”
রেকর্ড গড়া দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়া:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের নজিরবিহীন সমন্বয়ে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে ঝড়ের গতিতে:
২৪ মে (ঘটনার ৫ দিন পর): পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় নিখুঁত তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন।
১ জুন (ঈদের ছুটির পর): পবিত্র ঈদুল আজহার অবকাশকালীন ছুটির পরপরই ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জগঠন করে বিচার শুরু হয়। চার্জগঠনের দিন প্রধান আসামি সোহেল ‘ডলার’ নামে অন্য এক কাল্পনিক ব্যক্তির ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করলেও তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা মেলেনি।
২ জুন: মাত্র একদিনে মামলার ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে রামিসার বাবা, মা, বোন ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১৬ জনেরই সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ করেন আদালত।
৩ ও ৪ জুন: ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন উভয়পক্ষের আইনজীবীদের সমাপনী যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে কুখ্যাত খুনি সোহেল আদালতকে বলে, “আমার একটি ছোট ছাওয়াল (সন্তান) আছে স্যার। আমাকে দয়া করে মাফ করেন।” কিন্তু বিজ্ঞ আদালত তার এই আরজি খারিজ করে দেন।
ছুটি বাতিল করে রায় ঘোষণা:
দেশের অধস্তন বা বিচারিক আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাশকালীন বা গ্রীষ্মকালীন ছুটি চললেও এই স্পর্শকাতর মামলাটির বিচারিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালের সকল ছুটি বাতিল করে রেকর্ড ৪ কার্যদিবসেই রায় প্রস্তুত করেন বিচারক মাসরুর সালেকীন। আজ রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহতের স্বজন ও সাধারণ মানুষ এই দ্রুততম রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত এই ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানান।


