বেলা ১১টায় রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ক্লু-লেস ও চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আজ বেলা ১১টায় ঘোষণা করা হবে।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর নৃসংশভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত রায় আজ ঘোষণা করা হচ্ছে। আজ রবিবার (৭ জুন) বেলা ১১টার দিকে ঢাকার সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে এই রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) পঙ্কজ পিটার গোমেজ রায় ঘোষণার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন। ঢাকার ইতিহাসে নজিরবিহীন দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ মাত্র ৪ কার্যদিবসের মধ্যে এই নৃশংস হত্যা মামলার আইনি বিচারকাজ সম্পূর্ণ শেষ করে আজ রায় দেওয়ার দিন ধার্য করেছেন আদালত। ঢাকার ‘মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল’-এর বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত বহুল প্রতীক্ষিত এই রায় ঘোষণা করবেন।
কড়া নিরাপত্তায় আদালতে আসামিরা:
আদালত সূত্র জানায়, আজ সকাল ঠিক ৮টা ৫০ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিশেষ প্রিজন ভ্যানে করে মামলার প্রধান খলনায়ক ও খুনি সোহেল রানাকে ঢাকা সিএমএম (CMM) আদালত প্রাঙ্গণে হাজির করা হয়। এর কিছু আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একই মামলার অন্যতম সহযোগী আসামি এবং সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও কড়া পুলিশি পাহারায় আদালতে নিয়ে আসা হয়। রায় ঘোষণার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আইনি নিয়ম অনুযায়ী দুজনকে আদালত ভবনের প্রধান হাজতখানায় (Lock-up) রাখা হয়েছে।
আলোচিত এই শিশু হত্যা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই পুরো আদালত পাড়া ও ট্রাইব্যুনাল ভবনের চারপাশে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি, এনএসআই) চৌকস সদস্যরা।
রেকর্ড গড়া মাত্র ৪ কার্যদিবসের দ্রুততম বিচার:
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে কোনো ক্লু-লেস মার্ডার কেসের এত দ্রুততম সময়ে বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা বিরল। আদালত সূত্রে জানা যায়:
১ জুন: প্রধান আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সুনির্দিষ্ট ধারায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Charge) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
২ জুন: মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই দিন ধার্যকৃত মোট ১৮ জন আইনগত সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনেরই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ও জেরা মাত্র একদিনেই শেষ করেন বিজ্ঞ আদালত।
৩ জুন: ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে শুনানিতে আসামিরা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন।
৪ জুন: মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সমাপনী যুক্তিতর্ক (Arguments) উপস্থাপন শেষ হলে আদালত আজকের দিনটি (৭ জুন) রায়ের জন্য চূড়ান্ত ডেট ধার্য করেন।
ফ্ল্যাটের ভেতরেই শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়েছিল মস্তকবিহীন লাশ:
মামলার এজাহার ও পুলিশি তদন্তের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর পল্লবী এলাকার বাসা থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল স্থানীয় ‘পপুলার মডেল হাই স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা আক্তার। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবেশী সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার চকলেট ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রামিসাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ডেকে নেন।
পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসা যথাসময়ে স্কুলে না পৌঁছানোয় তার মা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য তলার বাসিন্দা সোহেলের বন্ধ দরজার সামনে নিজের মেয়ের স্কুল সু বা জুতো জোড়া দেখতে পান তিনি। এতে সন্দেহ হলে দরজায় অনবরত ধাক্কাধাক্কি ও ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।
অবশেষে রামিসার বাবা ও ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন জড়ো হয়ে একযোগে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা ভেতরে ঢুকে সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশু রামিসার রক্তাক্ত মস্তকবিহীন দেহ এবং খাটের পাশে থাকা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে কাটা মাথাটি ভাসতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘটনার পরপরই লম্পট সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও পুলিশ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাসা থেকে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে। পরবর্তীতে উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির (IT) সহায়তায় ঢাকা ও ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে প্রধান ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনায় গত ২০ মে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন নিহতের বাবা। দেশবাসী আজ এই পাষণ্ড দম্পতির সর্বোচ্চ সাজার প্রত্যাশা করছেন।


