সৌদি আরবে প্রথমবারের মতো অমুসলিম রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিল ভারত

১৯৪৮ সালের পর এই প্রথম সৌদি আরবে কোনো অমুসলিম কূটনীতিককে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ভারত। ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে প্রবীণ কূটনীতিক বিপুলকে বেছে নিল নয়াদিল্লি।

Jun 10, 2026 - 20:48
 0  2
সৌদি আরবে প্রথমবারের মতো অমুসলিম রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিল ভারত
×

ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে চলে আসা প্রচলিত প্রথা বা অঘোষিত নিয়ম ভেঙে এই প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে একজন অমুসলিম কূটনীতিককে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নয়াদিল্লি। ১৯৪৮ সালের পর সৌদি আরবের রিয়াদে ভারতের কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রদূত নিয়োগ পাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

​ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার রিয়াদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিশনের প্রধান হিসেবে ১৯৯৮ ব্যাচের অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ‘বিপুল’-কে বেছে নিয়েছে। বিপুল এর আগে কাতারে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া দুবাই, কায়রো ও জেনেভার মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলোতেও তাঁর কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

হজ ব্যবস্থাপনা ও প্রথা ভাঙার নেপথ্য কারণ:

​ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গত ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরবে কেবল মুসলিম কূটনীতিকদেরই রাষ্ট্রদূত হিসেবে রিয়াদে এবং কনসাল জেনারেল হিসেবে জেদ্দায় নিয়োগ দিত নয়াদিল্লি। এর পেছনে মূলত কোনো ধর্মীয় কারণ ছিল না, ছিল নিখাদ মাঠপর্যায়ের ব্যবহারিক ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা। ইন্দোনেশিয়ার পর ভারত থেকেই প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষ পবিত্র হজে যান। এই বিশাল সংখ্যক হাজির ব্যবস্থাপনা এবং সৌদি রাজপরিবার ও কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে মক্কা, মদিনা কিংবা মিনার মতো পবিত্র স্থানগুলোতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হতো।

​যেহেতু পবিত্র মক্কা নগরী ও নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় এলাকায় অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার আইনিভাবে সীমাবদ্ধ, তাই অতীতে কোনো জরুরি পরিস্থিতি—যেমন ১৯৯৭ সালের মিনায় অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় কোনো ট্র্যাজেডি—তৈরি হলে অমুসলিম রাষ্ট্রদূতের পক্ষে সেখানে গিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। এই ব্যবহারিক ও ভাষাগত সুবিধার কারণেই এতদিন মুসলিম কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।

​তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের পররাষ্ট্র ক্যাডারে (IFS) এই হাই-প্রোফাইল পদের জন্য যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ মুসলিম কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যোগ্য প্রার্থীর এতটাই অভাব দেখা দিয়েছিল যে বিগত বছরগুলোতে সরকারকে বর্তমান রাষ্ট্রদূতদের মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়েছে। এমনকি ২০১৬ সালের দিকে পেশাদার কূটনৈতিক বা খতিয়ানের বাইরে থেকে মুম্বাইয়ের সাবেক পুলিশ কমিশনার আহমদ জাভেদকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠাতে হয়েছিল। এবার সেই শূন্যতা দূর করতে এবং সম্পূর্ণ পেশাদার যোগ্যতার ভিত্তিতেই ‘বিপুল’-কে বেছে নেওয়া হয়েছে।

বদলে যাওয়া ‘ভিশন ২০৩০’ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি:

​কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব এখন আর ভারতের কাছে কেবল জ্বালানি তেল আমদানি বা রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসী শ্রমিকদের সাধারণ কোনো দেশ নয়। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অধীনে সৌদি আরব এখন প্রযুক্তি, বড় ধরনের বৈশ্বিক বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং সংস্কৃতির এক নতুন বিশ্বকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এখন রিয়াদ। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যার কৌশলগত অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা বেশি, তাকেই এই দায়িত্ব দেওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে সাউথ ব্লক।

​তাছাড়া বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিও বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। একদিকে ইরানের সাথে আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এই দ্বিমুখী ও সংবেদনশীল পরিস্থিতি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সামাল দিতে একজন অভিজ্ঞ ও তুখোড় পেশাদার কূটনীতিকের প্রয়োজন ছিল, যা বিপুলের প্রোফাইলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণে এই সিদ্ধান্তকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করা হলেও, মূলত যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের পরিবর্তিত কৌশলগত প্রয়োজনের তাগিদেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন না দেখে বরং যুগের সাথে কূটনৈতিক বিবর্তন হিসেবে দেখাই শ্রেয়।