ইফার নবনিযুক্ত ডিজি মুহিববুল্লাহর বিরুদ্ধে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) নবনিযুক্ত ডিজি মুহিববুল্লাহিল বাকীর বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতি, পদোন্নতি আদেশ জাল ও হালাল সনদ কেলেঙ্কারির নজিরবিহীন অভিযোগ।

Jun 7, 2026 - 10:19
 0  16
ইফার নবনিযুক্ত ডিজি মুহিববুল্লাহর বিরুদ্ধে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ
×

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) মুহিববুল্লাহিল বাকীর বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ তৈরি, অন্যের পদোন্নতি আদেশ জালিয়াতি, পদবি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বছরের পর বছর হজের সরকারি সুবিধা ভোগের মতো একাধিক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর জমা দেওয়া বিভিন্ন শিক্ষা সনদ, একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির গোপন প্রতিবেদন, সরকারি চিঠিপত্র, আদালতের নথি এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত জাতীয় পত্রিকার অনুসন্ধানী সংবাদ ঘেঁটে এই মহাপ্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তদুপরি, তিনি সরকারি চাকরিবিধি চরমভাবে লঙ্ঘন করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য পদ বাগিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও প্রমাণ রয়েছে।

​এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধর্মমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে সৌদি আরবে অবস্থান করায় তাঁর সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অবিশ্বাস্য শিক্ষা সনদ: ১০ বছর বয়সে দাওরায়ে হাদিস!

​অনুসন্ধানে দেখা যায়, মুহিববুল্লাহিল বাকী তাঁর সরকারি চাকরির মূল আবেদনে জন্মতারিখ উল্লেখ করেছেন ১ মে ১৯৭৪। নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি দাখিল (এসএসসি সমমান) পাস দেখিয়েছেন ১৯৮৮ সালে। অথচ, এর ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালেই তিনি ৪ বছর মেয়াদি দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) এবং একই সাথে পবিত্র কুরআনের হাফেজ (হিফজ) হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

​গাণিতিক ও যৌক্তিক হিসাব অনুযায়ী, তিনি মাত্র ১৩ বছর ৩ মাস বয়সে দাখিল এবং ১৪ বছর ৭ মাস বয়সে মাস্টার্স (দাওরা) পাস করেছেন! অর্থাৎ, এই কাল্পনিক তথ্য সত্যি হলে, তাঁকে মাত্র ১০ বছর ৭ মাস বয়সে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার আগেই দাওরায়ে হাদিসের মতো উচ্চতর শ্রেণিতে ভর্তি হতে হয়েছিল— যা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও জালিয়াতির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া তাঁর ফাজিল (ডিগ্রি) পরীক্ষার মূল সনদ ও নম্বরপত্রের (মার্কশিট) শিক্ষাবর্ষের মধ্যেও মারাত্মক বৈষম্য ও গরমিল পাওয়া গেছে।

হাটহাজারী মাদ্রাসার তদন্তে ‘সনদ জাল’ প্রমাণিত:

​১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে পেশ ইমাম হিসেবে মুহিববুল্লাহর নিয়োগের পরপরই তৎকালীন জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ‘ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ইমাম নিয়োগ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৭ জুলাই ইসলামিক মিশনের তৎকালীন পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

​তদন্ত কমিটি সরেজমিনে চট্টগ্রামের আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উপস্থিতিতে মুহিববুল্লাহর দাখিল করা দাওরা সনদ ও মার্কশিটের ফটোকপি যাচাই করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে তদন্ত কমিটিকে জানায় যে:

​সনদের সাইজ, বর্ণনা ও মনোগ্রাম সম্পূর্ণ জাল। মাদ্রাসার আসল সনদের সাথে এর কোনো মিল নেই।

​মুহিববুল্লাহিল বাকী ৪ বছরের মার্কশিট একত্রে জমা দিয়েছেন, অথচ হাটহাজারী মাদ্রাসায় প্রতি বছর পৃথক পৃথক মার্কশিট দেওয়া হয়; কখনো একত্রে দেওয়া হয় না।

তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করে, “মুহিববুল্লাহিল বাকীর পেশকৃত দাওরায়ে হাদিসের সনদপত্রটি সম্পূর্ণ জাল ও ভুয়া।”

সিনিয়র পেশ ইমামের পদোন্নতি আদেশ ও নথি জালিয়াতি:

​অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মুহিববুল্লাহিল বাকী নিজে একজন সাধারণ পেশ ইমাম হওয়া সত্ত্বেও ২০১৯ সালে বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম মিজানুর রহমানকে নীতিগতভাবে ফাঁসাতে ২০১৫ সালের একটি সরকারি পদোন্নতি আদেশ হুবহু জাল করেন। এরপর একটি ভুয়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা (Seniority List) তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন।

​পরবর্তীতে ২০২২ সালে ইফা কর্তৃক গঠিত ৩ সদস্যের আরেকটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি বিষয়টি গভীর অনুসন্ধান করে এবং আদালতে জমা দেওয়া ‘সংযুক্তি- এফ ও জি’ নামক কাগজপত্রের কোনো দাপ্তরিক অস্তিত্ব নেই বলে প্রতিবেদন দাখিল করে। তথ্য অধিকার আইনের (RTI) অপব্যবহার করে জাল কাগজে মামলা করার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

অবৈধ ‘হালাল সনদ’ কেলেঙ্কারি ও বরখাস্তের ইতিহাস:

​চাকরিবিধি ভঙ্গ ও চরম অসদাচরণের কারণে ২০০৮ সালের ১২ আগস্ট তাঁকে আন্দরকিল্লা মসজিদে বদলি করা হলে তিনি তা অমান্য করেন। ফলশ্রুতিতে ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর তাকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত (Suspend) করা হয় এবং ২০০৯ সালে চার্জশিট গঠন করা হয়। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন বিতর্কিত ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালের কাছে লিখিত ক্ষমা চেয়ে তিনি পার পেয়ে যান।

​এছাড়া ‘হালাল বাংলাদেশ সার্ভিসেস লি.’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লোগো ব্যবহার করে অবৈধভাবে জাল ‘হালাল সনদ’ প্রদান এবং মুফতি ইনচার্জ হিসেবে নিজে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করার অপরাধে ২০১৫ সালের ২০ মে তাকে কড়া ‘কারণ দর্শানো নোটিশ’ বা শোকজ করা হয়। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই ঘটনাকে চাকরিবিধির ৩৯(খ) ও (ছ) ধারা অনুযায়ী ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কাজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।

দেশ ও জাতির জন্য ‘অশনিসংকেত’: ক্ষুব্ধ আলেম সমাজ

​গত ২১ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ইফার নতুন ডিজি হিসেবে মুহিববুল্লাহিল বাকীর নাম ঘোষণা করা হয়। হজের দাপ্তরিক কাজ শেষে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় তিনি দেশে ফিরেছেন এবং যেকোনো সময় যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তাঁর এই যোগদানের খবরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

​ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জালিয়াতির এই ভয়াবহ বিবরণ শুনে থমকে যেতে হয়। এমন একজন চিহ্নিত জালিয়াত ও প্রতারককে দেশের প্রধানতম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক বানাল কে? এই বিতর্কিত নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করে উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্ত হওয়া দরকার।”

​আলেমদের একাংশ মনে করছেন, একজন ভুয়া সনদধারী ও দাপ্তরিক নথি জালকারী ব্যক্তি যদি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো সংবেদনশীল ও পবিত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন হন, তবে তা দেশ ও ইসলামের জন্য চরম ‘অশনিসংকেত’ বয়ে আনবে এবং সাধারণ মানুষের মনে আলেম সমাজ সম্পর্কে স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে।

সূত্র: কালবেলা নিউজ