দিল্লিতে পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র বিক্ষোভ, ৫ দফা দাবি
ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর-মন্তরে তেলাপোকার মুখোশ পরে অভিনব বিক্ষোভ করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
ভারতের শিক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় চলমান নজিরবিহীন জালিয়াতি, অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে দেশটির রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরে এক অভিনব ও ব্যতিক্রমী গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই প্রতীকী ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) ব্যানারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও তরুণ পেশাজীবী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। দিল্লির তীব্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝেই অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে সম্প্রতি দেশে ফেরা সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই অভিনব সমাবেশে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের অনেকের মুখেই ছিল ‘তেলাপোকা’র (Cockroach) মুখোশ এবং হাতে ছিল একগুচ্ছ ফুল। তেলাপোকা যেমন শত প্রতিকূলতার মাঝেও ডাস্টবিন ও নোংরা আবর্জনার ভেতর টিকে থাকে, তেমনি ভারতের বর্তমান ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘তেলাপোকা’র মতো ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবেই এই রূপক মুখোশ ব্যবহার করা হয়েছে। সমাবেশ থেকে ভারতের বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে ৫টি প্রধান দাবি বা এজেন্ডা সংবলিত একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত ৫ দফা দাবি:
১. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ছাড়া ডিজিটাল শিক্ষা নয়: যথাযথ মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়া জোরপূর্বক শিক্ষা খাতে কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যাবে না। আন্দোলনকারীদের মতে, ব্যাংকিং খাতের মতো ভারতের শিক্ষা ক্ষেত্রেও ডিজিটাল মূল্যায়নের নামে দুর্নীতি, অপব্যবহার ও বড় ধরনের অনিয়মের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২. মণিপুরের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা: জাতিগত সহিংসতার কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। অবিলম্বে সেখানে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পঠন-পাঠন পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার দাবি জানানো হয়।
৩. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শতভাগ স্বচ্ছতা: একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির কারণে ভারতের লাখো প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর বছরের পর বছর করা কঠোর পরিশ্রম ও স্বপ্ন এক নিমেষেই বিফলে যাচ্ছে। তাই ‘জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা’র (NTA) অধীনে অনুষ্ঠিত সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় গ্রহণযোগ্যতা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সংকট সমাধান: শিক্ষা খাতের যেসব সমস্যা সরাসরি ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের দৈনন্দিন জীবনকে তীব্রভাবে প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারকে এক নম্বর অগ্রাধিকার (Priority) দিয়ে দ্রুত সমাধান করতে হবে।
৫. মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি: পরীক্ষা নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা, প্রশ্ন ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের কারণে ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই মানসিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কঠোর আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘জয় ভীম’ স্লোগানে মুখর দিল্লি:
বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং বিতর্কিত ‘অন-স্ক্রিন মূল্যায়ন’ পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করেন। এই সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও কথিত দুর্নীতির জন্য সরাসরি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এককভাবে দায়ী করা হয়।
সমাবেশ থেকে হাজারো তরুণ একযোগে ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে’, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান দূর হটো’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এবং ‘জয় ভীম’ স্লোগানে দিল্লির রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। স্কুলপড়ুয়া ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে অভিভাবক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই সম্মিলিত অংশগ্রহণ দিল্লির যন্তর-মন্তরে এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী নাগরিক প্রতিরোধের আবহ তৈরি করে।


