কেন ভেস্তে গেল যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের শান্তি আলোচনা?
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকের পরও কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান; পারমাণবিক কর্মসূচি ও কঠোর শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানে ভেস্তে গেল শান্তি আলোচনা।
ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। তবে টানা ২১ ঘণ্টার স্নায়ুক্ষয়ী বৈঠকের পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি পক্ষ দুটি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা আবারও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। এই ব্যর্থতার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে।
ইরানের অভিযোগ: যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ অবস্থান
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের স্বার্থ রক্ষায় তাঁদের প্রতিনিধিদল সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক ও কঠোর’ অবস্থানের কারণে আলোচনা এগোয়নি। তেহরানের দাবি, তারা একাধিক সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এমন সব দাবি তুলেছে যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। ইরানের মতে, ওয়াশিংটন মূলত সমঝোতার টেবিল ছাড়ার অজুহাত খুঁজছিল এবং তাদের দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অভিযোগ: সদিচ্ছার অভাব
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, তাঁরা ‘চূড়ান্ত এবং সেরা প্রস্তাব’ নিয়ে টেবিলে বসেছিলেন। তাঁর মতে, এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতিকর হবে। ভ্যান্স স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা আমাদের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু ইরানের প্রতিনিধিদল আমাদের শর্তগুলো মেনে নেয়নি।”
মূল বাধা: পারমাণবিক অস্ত্র ও দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি সামনে এসেছে। জেডি ভ্যান্স জানান:
মার্কিন দাবি: ইরানকে দীর্ঘমেয়াদী এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দিতে হবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
ইরানের অবস্থান: তেহরান এই ধরনের একতরফা ও কঠোর শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ভ্যান্সের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করা হলেও তাদের ভবিষ্যৎ মানসিক অঙ্গীকারের অভাবই চুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়।
আলোচনার নেপথ্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে গত এক দশকের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এবং ইরানের পক্ষে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নেতৃত্ব দেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বৈশ্বিক প্রভাব ও শঙ্কা
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে, তা স্থায়ী রূপ না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকট: হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি এবং তেল-গ্যাসের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল-লেবানন ইস্যু: লেবাননে চলমান হামলা ও ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে কোনো সুরাহা না হওয়ায় যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামাবাদ হোটেলের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল না আসায় এখন সবার নজর হোয়াইট হাউস ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


