যুক্তরাষ্ট্রে গণহারে ছাঁটাই হচ্ছেন ভারতীয়রা, কিন্তু কেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে ব্যয় কমানোর ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এইচ-১বি (H-1B) ভিসাধারী ভারতীয় আইটি পেশাজীবীরা। চাকরি হারিয়ে দেশ ছাড়ার ঝুঁকিতে হাজারো প্রবাসী।

May 24, 2026 - 10:27
 0  1
যুক্তরাষ্ট্রে গণহারে ছাঁটাই হচ্ছেন ভারতীয়রা, কিন্তু কেন
×

বিশ্ব প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (USA) চলমান তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যয় কমানোর (Cost-cutting) অংশ হিসেবে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় আইটি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়েছে। আর এই গণছাঁটাইয়ের করাল গ্রাসে পড়ে সবচেয়ে বেশি অবর্ণনীয় বৈষম্য ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছেন এইচ-১বি (H-1B) ভিসার অধীনে কর্মরত হাজার হাজার উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ভারতীয় পেশাজীবী। আকস্মিক চাকরি হারানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ভবিষ্যৎ ও বৈধ অবস্থান নিয়ে তাঁদের মাঝে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

​ভারতীয় শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে সিলিকন ভ্যালিসহ মার্কিন প্রযুক্তি খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এইচ-১বি ভিসার কঠিন শর্ত ও দেশ ছাড়ার খড়্গ:

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ের এই শক্তিশালী ঢেউয়ে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ভারতীয় অভিবাসী কর্মীরা সংখ্যাগত দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসাধারীদের জন্য বর্তমান মার্কিন পরিস্থিতি আরও বেশি মরূদ্যান হয়ে উঠেছে।

​যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন ও ভিসা নীতিমালা অনুযায়ী, এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান (Employer) কর্মীকে স্পন্সর করে থাকে। ফলে কোনো কর্মী চাকরি হারালে বা প্রতিষ্ঠান তাঁকে ছাঁটাই করলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজের বৈধ অবস্থান বজায় রাখতে তাঁকে নির্দিষ্ট ও অত্যন্ত সীমিত সময়ের (সাধারণত ৬০ দিন) মধ্যে নতুন কোনো আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি খুঁজে নিতে হয় এবং সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিসার নতুন স্পন্সরশিপ নিশ্চিত করতে হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন স্পন্সর বা চাকরি পেতে ব্যর্থ হলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সপরিবারে দেশ ছাড়তে হয়। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মার্কিন বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও কর্মী চাহিদার রূপান্তর:

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গতানুগতিক কোডিং বা আইটি সেবার চেয়ে রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) কার্যক্রমে বেশি পুঁজি বিনিয়োগ ও গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অভাবনীয় ও দ্রুত উত্থানের ফলে বিশ্ব আইটি খাতের সামগ্রিক কর্মী চাহিদায় বড় ধরনের রূপান্তর বা পরিবর্তন এসেছে। এআই-এর কারণে অনেক প্রযুক্তিগত কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক দক্ষ মানবসম্পদের চাকরি এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যার বড় শিকার হচ্ছেন ভারতীয় আইটি ইঞ্জিনিয়াররা।

বিপর্যস্ত প্রবাসী পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন:

আমেরিকান বিভিন্ন বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যেভাবে রাতারাতি ইমেইলের মাধ্যমে কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনছে, তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল ওই কর্মীদের চাকরির ওপরই পড়ছে না, বরং প্রবাসী পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে।

​যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক ভারতীয় নাগরিক দীর্ঘ এক বা দুই দশক ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে পরিবার গড়ে তুলেছেন, সন্তানদের স্থানীয় নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করাচ্ছেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি বা গাড়ি কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জীবন সাজিয়েছেন। হঠাৎ করে এই মধ্যবয়সে এসে ছাঁটাইয়ের মুখে পড়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সন্তানদের শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা প্রবাসীদের মাঝে তীব্র মানসিক ও সামাজিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।