বন্যায় দেশে ৫৪ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ
ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের ৮টি জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখের বেশি মানুষ। পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের জেরে প্রবল ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দেশের ৮টি জেলায় সৃষ্ট বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখের বেশি মানুষ। দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি হতে শুরু করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন দুর্গত মানুষের জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর পিআইডি সম্মেলন কক্ষে দেশের বন্যা পরিস্থিতি, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি:
সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণমন্ত্রী জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রথমে চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য এলাকা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান), চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং পরবর্তীতে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের কিছু অংশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এই দুর্যোগে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ৮টি জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৬৮টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সরকারি হিসেবে মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪৪১ জন। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমরা ৫৪ জন নাগরিককে হারিয়েছি, যাদের বেশির ভাগই মূলত পাহাড়ধসের ঘটনায় মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।”
উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম:
বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
আর্থিক বরাদ্দ: ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তার জন্য ইতিমধ্যে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নগদ এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা করে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য সহায়তা: উপদ্রুত এলাকায় ৩ হাজার ২৫০ টন চাল এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান: দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের স্পিডবোট ও রাবার বোট দিনরাত কাজ করছে।
পুনর্বাসন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ জোর:
ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “যেহেতু বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে এবং পানি নামতে শুরু করেছে, তাই আমাদের মূল লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার এখন ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা। কৃষিখাতের ক্ষয়ক্ষতির চুলচেরা মূল্যায়ন চলছে, সেই অনুযায়ী কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া বন্যা-পরবর্তী সংক্রামক রোগবালাই মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।”
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুততম সময়ে সংস্কারের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ যৌথভাবে কাজ করবে। ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা সড়কগুলো গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (কাবিখা ও কাবিটা) কর্মসূচির মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হবে। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ অব্যাহত থাকবে।
উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছেন মন্ত্রী:
এ বছরের বন্যাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ একটি দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা একাধিকবার আমাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় আগামীকাল বুধবার থেকেই আমি নিজেই বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছি।” সংবাদ সম্মেলন শেষেই মন্ত্রী চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স:
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেজিং প্রকল্পে বিগত সরকারের সময়কার বিপুল অর্থ অপচয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকারের অবস্থান দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’। আগের সরকারের আমলে কী লুটপাট বা দুর্নীতি হয়েছে, সেটি ভিন্ন বিষয়। আমাদের এই সরকার কোনো ধরনের দুর্নীতি বা ধামাচাপাকে প্রশ্রয় দেবে না। মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি করা হচ্ছে এবং কোনো প্রকল্পে অনিয়ম পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আজকের এই উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব মো. সাইদুর রহমান খান।


