প্রযুক্তি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের দেশে যেভাবে সুদৃঢ় হচ্ছে ইসলামের অবস্থান

প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের দেশ জাপানে নীরবে বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা। ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত জাপানে ইসলামের অগ্রযাত্রা, প্রথম মসজিদ এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জের বিস্তারিত চিত্র।

Jun 29, 2026 - 20:55
 0  4
প্রযুক্তি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের দেশে যেভাবে সুদৃঢ় হচ্ছে ইসলামের অবস্থান
×

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সুদৃঢ় শৃঙ্খলাবোধ এবং হাজার বছরের অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত দেশ জাপান। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ ও শিন্টো ঐতিহ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও, গত কয়েক দশকে সেখানে নীরবে এক নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। অভিবাসন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জাপানিদের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, তেমনি ইসলামও ধীরে ধীরে জাপানের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হচ্ছে।

​জনসংখ্যা ও বর্তমান চিত্র

​সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির গ্রাফ বেশ ঊর্ধ্বমুখী। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:

​২০১০ সাল: জাপানে মুসলিমের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার।

​২০১৯ সাল: তা প্রায় ১১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩০ হাজারে।

​২০২৪ সালের শেষ নাগাদ: ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার গবেষণা অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে উন্নীত হয়েছে।

​এটি জাপানের মোট জনসংখ্যার (প্রায় ১২ কোটি ৬০ লাখ) আনুমানিক ০.৩ শতাংশ। জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী (যেমন—বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ইন্দোনেশীয় ও মালয়েশীয়) এবং বাকি ১০ শতাংশ স্থানীয় জাপানি নবমুসলিম। রাজধানী টোকিওতে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় জনবসতি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ওসাকা, নাগোয়া, ইয়োকোহামা, হিরোশিমা ও কিয়োটোসহ বড় বড় শিল্পনগরীগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

​ইসলামের আগমন ও ঐতিহাসিক পথরেখা

​১. প্রাথমিক যোগাযোগ (১৮৬৮ সালের পূর্বে)

​অষ্টম শতকের দিকে বাণিজ্যিক রুটের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে ইসলামি সভ্যতার প্রথম পরোক্ষ যোগাযোগের সূচনা হয়। পারস্যের বিখ্যাত মানচিত্রবিদ ইবনে খোরদাদবেহ তাঁর লেখায় জাপানকে ‘ওয়াকওয়াক’ (Waqwaq) নামে উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১২৭৫ সালে ইউয়ান চীন থেকে ‘সদর উদ-দীন’ নামের এক মুসলিম কূটনৈতিক দূত জাপানে এসেছিলেন। পরবর্তীতে ১৭ শতকে থাইল্যান্ড হয়ে ইরানি বণিকেরা নাগাসাকিতে বাণিজ্য করতে আসেন।

​২. আধুনিক যুগের সূচনা (১৯ শতকের শেষভাগ)

​১৮৭৭ সালে জাপানি ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী প্রথম অনূদিত হয়, যা জাপানি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে তাত্ত্বিক কৌতুহল তৈরি করে।

​১৮৯০ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ‘আরতুগরুল’ (Ertugrul) নামের একটি যুদ্ধজাহাজ জাপানে পাঠান। ফেরার পথে ভয়াবহ ঝড়ে জাহাজটি ডুবে গেলে শওতারো নোদা নামের এক জাপানি সাংবাদিক জীবিত অটোমান নাবিকদের সাহায্য করতে কনস্টান্টিনোপলে যান এবং সেখানে ইসলাম গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন 'আবদুল হালিম'। তাঁকে প্রথমদিকের জাপানি মুসলিমদের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।

​৩. ২০ শতকের প্রথমার্ধ ও প্রথম মসজিদ

​১৯০৯ সালে মিতসুতারো তাকাওকা ভারতের বোম্বেতে ইসলাম গ্রহণ করে 'ওমর ইয়ামাওকা' নাম নেন এবং প্রথম জাপানি হিসেবে পবিত্র হজ পালন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও বলশেভিক বিপ্লবের পর মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া থেকে আগত তাতার, উজবেক ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের মুসলিম শরণার্থীরা জাপানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। তাঁদের হাত ধরেই জাপানে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মুসলিম সমাজ ও মসজিদ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়ে ওঠে।