বোমা মেরে হরমুজ খুলে দেওয়ার অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্রের
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ভেঙে গেছে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও চরম উত্তেজনার পারদ চড়ার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দাবি করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রণালিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার বিপরীতে ওয়াশিংটনের দাবি, নৌপথটি এখনও উন্মুক্ত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে। একই সাথে ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে নৌপথটি নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী করার অনুরোধ জানিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই নতুন উত্তেজনা তখন শুরু হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে যে তারা ইরানের অভ্যন্তরে ১৪০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাব ও প্রতিশোধ হিসেবেই এই বিধ্বংসী সামরিক আঘাত হানা হয়েছে।
সাইপ্রাসের জাহাজে হামলা ও ক্রুদের জাহাজ ত্যাগ
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সাইপ্রাসের পতাকাবাহী ‘এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে জাহাজটির ইঞ্জিন রুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটি সাগরে অচল হয়ে পড়ে। হামলায় একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলেও জানিয়েছে মার্কিন সেন্টকম।
এদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সামরিক কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানি হামলার পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে জাহাজটির ক্রুরা সেটি ত্যাগ করে লাইফবোটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আইআরজিসির দাবি, ওই জাহাজটি তাদের নির্দেশিত সামুদ্রিক রুট অনুসরণ না করায় সেটিকে লক্ষ্য করে নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। একই সাথে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সব জাহাজকে ইরানের প্রস্তাবিত রুটই ব্যবহার করতে হবে।
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলা ও ইরানের পাল্টা আঘাত
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের ‘কেশম দ্বীপ’ লক্ষ্য করে শত্রুপক্ষ (যুক্তরাষ্ট্র) একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। উল্লেখ্য, এই দ্বীপটিতে আইআরজিসির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নৌঘাঁটি রয়েছে। এর জবাবে আইআরজিসিও রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর ব্যাপক পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে।
রবিবার সন্ধ্যায় মার্কিন সেন্টকম এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে দুর্বল করে দেওয়া।
ভেঙে গেল ট্রাম্প-আরাগচি যুদ্ধবিরতি চুক্তি
এই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের ফলে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন খাদের কিনারায়। ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সাম্প্রতিক উসকানিমূলক হামলার ফলে সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত শেষ বা বাতিল হয়ে গেছে।
এর বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উল্টো অভিযোগ করে বলেছেন, তেহরান নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তবে চুক্তি ভাঙার এই টানাপোড়েনের মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা আবারও দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনা শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


