কওমী আলেমদের চ্যালেঞ্জ এড়ানোর ঐতিহ্য ভাঙল জামায়াত, তবে ঢাল হিসেবে মাঠে সেই কওমি গ্র্যাজুয়েটই!

ইতিহাসে এই প্রথম কওমি ওলামাদের দেওয়া কোনো চ্যালেঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করল জামায়াত ঘরানার কোনো আলেম। মুফতি আবরারের ‘সাহাবা সমালোচনা’র পাল্টা জবাব দিতে পডকাস্টের ডাক দিলেন কওমি পড়ুয়া জামাতপন্থী আলেম মুফতি ওসামা।

Jul 2, 2026 - 11:42
 0  27
কওমী আলেমদের চ্যালেঞ্জ এড়ানোর ঐতিহ্য ভাঙল জামায়াত, তবে ঢাল হিসেবে মাঠে সেই কওমি গ্র্যাজুয়েটই!
×

দেশের ইসলামি অঙ্গনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, কওমি ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে আদর্শিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে দেওয়া কোনো চ্যালেঞ্জ বা বাহাসের ডাক আজ পর্যন্ত জামায়াত ঘরানার কোনো আলেম আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি। তবে সেই ধারা ভেঙে এই প্রথম কওমি ঘরানার এক শীর্ষ আলেমের দেওয়া চ্যালেঞ্জ সরাসরি গ্রহণ করলেন কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়া এক জামাতপন্থী আলেম।

​মূল ঘটনাটি ঘটেছে দেশের দুই আলোচিত তরুণ আলেম মুফতি রেজাউল করীম আবরার এবং মুফতি আলী হাসান ওসামার মধ্যে। একটি কনফারেন্স থেকে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর ‘সাহাবা সমালোচনা’র বিরুদ্ধে মুফতি আবরারের দেওয়া প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের পর, এবার তাঁদের মধ্যে একটি দীর্ঘ ভার্চুয়াল ‘ইলমি পডকাস্ট’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক মুখোমুখি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।

যে কনফারেন্স থেকে আবরারের মূল চ্যালেঞ্জ:

​ঘটনার সূত্রপাত হয় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি ‘শানে সাহাবা কনফারেন্স’ থেকে। উক্ত কনফারেন্সে মুফতি রেজাউল করীম আবরার জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীর বিতর্কিত কিতাব ‘খেলাফত ও মুলুকিয়াত’ (খেলাফত ও রাজতন্ত্র)-এর ওপর বিশদ ও কঠোর পর্যালোচনা করেন। সেখান থেকেই তিনি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, তিনি মওদুদীর বই ও বিভিন্ন রেফারেন্স থেকেই সরাসরি প্রমাণ করবেন যে, মওদুদী সাহাবিদের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং তাঁদের নিয়ে ভুরি ভুরি মিথ্যাচার ও খেয়ানত করেছেন।

ওসামার ‘ইছমতে আম্বিয়া’র প্রস্তাব ও বিষয়ের ফারাক:

​মুফতি আবরারের এই ওপেন চ্যালেঞ্জের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী এবং জামায়াতপন্থী আলেম হিসেবে পরিচিত মুফতি আলী হাসান ওসামা ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে মুফতি আবরারকে ভার্চুয়াল ইলমি পডকাস্টের আহ্বান জানান।

​তবে ওসামা এখানে কৌশলে মূল চ্যালেঞ্জের বিষয়টিকে কিছুটা ঘুরিয়ে দিয়ে ‘ইছমতে আম্বিয়া’ (নবীদের নিষ্পাপত্ব) ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসেন। তিনি প্রস্তাব করেন, মওদুদীকে ইছমতে আম্বিয়া অস্বীকারকারী গোমরাহ বলা যায় কি না—এই বিষয়ে আগে আলোচনা হোক, এটি শেষ হলে পরের ধাপে ‘আদালাতে সাহাবা’ নিয়ে বসা যাবে।

আবরারের অনড় অবস্থান ও ওল্টো চ্যালেঞ্জ:

​মুফতি ওসামা আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করতে চাইলেও নিজের মূল ফোকাস ও চ্যালেঞ্জে শতভাগ অনড় অবস্থান নেন মুফতি রেজাউল করীম আবরার। ওসামার পোস্টের জবাবে পাল্টা পোস্ট দিয়ে মুফতি আবরার সাফ জানিয়ে দেন, আলোচনার ট্র্যাক পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।

​মুফতি আবরার স্পষ্ট ভাষায় ওল্টো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, যেহেতু কনফারেন্স থেকে ছুড়ে দেওয়া মূল চ্যালেঞ্জের মূল বিষয়ই ছিল ‘সাহাবা সমালোচনা’, তাই টেবিলে বসলে আগে এই বিষয়েই ফয়সালা হতে হবে। তিনি তাঁর পোস্টে দৃঢ়তার সাথে বলেন:

​“আমি প্রমাণ করব, মওদুদি মরহুম সাহাবা সমালোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে মওদুদি মরহুম খেয়ানত এবং মিথ্যাচার করেছেন ভুরি ভুরি, যেগুলোর কারণে মওদুদি মরহুম আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি (ওসামা ভাই) মওদুদি মরহুমের সেগুলো সহিহ প্রমাণ করবেন।”

​মুফতি আবরার সাফ জানিয়ে দেন, চ্যালেঞ্জের মূল বিষয় অনুযায়ী ‘মিয়ারে হক ও সাহাবা সমালোচনা’র দলিলভিত্তিক চূড়ান্ত মীমাংসা হওয়ার পরই কেবল ওসামার আকাঙ্ক্ষিত ‘ইছমতে আম্বিয়া’ বা অন্য কোনো বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা হতে পারে।

ঐতিহাসিক বাহাসের অপেক্ষায় নেটিজেনরা:

​কওমি ওলামাদের চ্যালেঞ্জ জামায়াতপন্থীদের এড়িয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিনের যে সংস্কৃতি ছিল, তা ভেঙে কওমি পড়ুয়া জামাতপন্থী আলেম মুফতি ওসামা যেভাবে মুফতি আবরারের মুখোমুখি হতে সম্মতি জানিয়েছেন, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। ওসামা মওদুদীর পক্ষে সাফাই গেয়ে আবরারের কড়া চ্যালেঞ্জ কতটুকু মোকাবিলা করতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত ‘সাহাবা সমালোচনা’র টেবিলে এই দুই তরুণ স্কলারের দলিলভিত্তিক লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখতে এখন পুরো দেশের আলেম সমাজ ও ইসলামপ্রিয় নেটিজেনরা উন্মুখ হয়ে আছেন।