লামায় ঠিকাদারের গাফিলতি, সড়ক ও ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধ

বান্দরবানের লামা উপজেলার কুমারী-চাককাটা সড়কের উন্নয়ন ও ব্রিজ নির্মাণ কাজ মাঝপথে ফেলে রেখে ঠিকাদার উধাও। সচল ব্রিজ ভেঙে ফেলায় পাহাড়ি ঢলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, চরম দুর্ভোগে হাজারো বাসিন্দা।

Jul 15, 2026 - 13:11
 0  3
লামায় ঠিকাদারের গাফিলতি, সড়ক ও ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধ
×

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের কুমারী-চাককাটা সড়কের উন্নয়ন কাজ ও নতুন ব্রিজ নির্মাণে চরম অনিয়ম, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ঠিকাদারের চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। কাজের শুরুতেই সচল ও পুরনো একটি ব্রিজ ভেঙে ফেলে নতুন ব্রিজ না বানিয়েই কাজ বন্ধ করে ঠিকাদার উধাও হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এর ফলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, গর্ভবতী নারী ও মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কৃষিজীবী মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে না পারায় চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

​৩ কোটির প্রকল্পে অনিয়মের পাহাড়:

সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে কুমারী-চাককাটা সড়কের ২ কিলোমিটার কার্পেটিং ও ব্রিজ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। চুয়াডাঙ্গার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ কন্সট্রাকশন কাগজের কলমে কাজটি পেলেও বাস্তবে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজটি করছিলেন বান্দরবানের স্থানীয় ঠিকাদার মেহেদী হাসান। কয়েক মাস আগে কাজ শুরু করে আনুমানিক ৭০ ভাগ কাজ করার দাবি করলেও বর্তমানে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

​সচল ব্রিজ ভেঙে মালামাল বিক্রির অভিযোগ:

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পরপরই সড়কের স্কুলপাড়া এলাকার সচল ও পুরনো ব্রিজটি ভেঙে ফেলা হয়। ব্রিজটি ভাঙার পর তার ভেতরের পুরাতন রড, ইটসহ মূল্যবান সামগ্রী ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ গোপনে বিক্রি করে দেন। নতুন ব্রিজ নির্মাণের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ঠিকাদার কাজ ফেলে রাখায় বর্তমানে সামান্য বৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢল ও পানির তোড়ে যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি নড়বড়ে সাঁকো তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। এলাকাবাসীর ক্ষুব্ধ প্রশ্ন—কাজ যদি শেষ করার সদিচ্ছাই না থাকবে, তবে সচল পুরনো ব্রিজটি ভেঙে ফেলার কী প্রয়োজন ছিল?

​কাদামাটিতে রূপ নিয়েছে সড়ক:

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, সড়কের খোয়া বিছানোর কাজ মাঝপথে বন্ধ থাকায় সাম্প্রতিক বর্ষায় পুরো সড়কটি এখন গভীর কাদামাটিতে রূপ নিয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও নালা। কোনো ধরনের যানবাহন তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলারও কোনো উপায় নেই।

​চাককাটা গ্রামের বাসিন্দা বেলাল হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, “ঠিকাদার মেহেদী হাসান কাজ অসমাপ্ত রেখেই এলাকা থেকে গায়েব হয়ে গেছেন। ইচ্ছে করলে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব ছিল। আমরা বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাইনি।”

​ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি:

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন মজুমদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ঠিকাদারের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে শত শত মানুষ আজ ঘরবন্দি ও চরম ভোগান্তির শিকার। আমি এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—অনতিবিলম্বে এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ পুনরায় শুরু করা হোক এবং জনভোগান্তি সৃষ্টির দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

অভিযোগ অস্বীকার ঠিকাদারের:

এদিকে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মেহেদী হাসান দাবি করেন, “আমি বর্ষা শুরুর আগেই ৭০ ভাগ কাজ শেষ করেছিলাম, শুধু কার্পেটিংয়ের অংশটুকু বাকি ছিল। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বর্ষণ শুরু হওয়ায় বাধ্য হয়ে কাজ সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়েছে।” খুব দ্রুতই আবহাওয়া অনুকূলে এলে কাজ পুনরায় শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।

দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস এলজিইডির:

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লামা উপজেলা প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, “কুমারী-চাককাটা সড়কের কাজের ধীরগতি ও ব্রিজের কারণে জনগণের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা জেনেছি। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্রিজ ও সড়কের বাকি কাজ সম্পন্ন করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”