জিয়াউর রহমান হত্যার ৪৫ বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর আটক
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে বনানী ডিওএইচএস থেকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার দীর্ঘ ৪৫ বছর পর এই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে আটককৃত সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্নের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বনানী ডিওএইচএস-এ মধ্যরাতের চিরুনি অভিযান:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পলাতক থাকা মেজর মোজাফফর হোসেন রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় আত্মগোপন করে আছেন—এমন একটি নিবিড় ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত রাতে সেখানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ডিবি। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “বনানী ডিওএইচএস থেকে গত রাতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফরকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও পরিচয়-মামলার নথিপত্র সম্পূর্ণভাবে যাচাই করার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আজ বৃহস্পতিবার তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
৪৫ বছর যেভাবে এড়িয়েছেন গ্রেপ্তার:
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ১৯৮১ সালের ওই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকেই মেজর মোজাফফর হোসেন অত্যন্ত চতুরতার সাথে দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালালেও তিনি বারবার কৌশল বদলে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে সাম্প্রতিক নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অবশেষে এই চক্রব্যূহ ভাঙতে সক্ষম হয় ডিবি পুলিশ। এখন আদালতের দেওয়া চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ফিরে দেখা: কী ঘটেছিল ১৯৮১ সালের সেই কালরাতে?
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে মেজর মোজাফফর হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৯ মে দুই দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার এই আকস্মিক সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও নেতাদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধের স্থায়ী নিরসন করা।
চট্টগ্রামে পৌঁছে সফরের প্রথম দিনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক সফল বৈঠক শেষে সার্কিট হাউসের কক্ষে ঘুমাতে যান জিয়াউর রহমান। কিন্তু তার ঘুমাতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোররাতে সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহী দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সার্কিট হাউসে আকস্মিক হামলা চালায়। তারা রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জিয়াউর রহমান। ঘটনার পরদিন ৩০ মে সকালে রেডিওর বিশেষ বুলেটিনে দেশবাসী প্রথমবারের মতো এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে পারে।


