‘বৃদ্ধাশ্রমে ইফতার আসে, কিন্তু সন্তানেরা আসে না’

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ওল্ড অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হোমে ইফতারের কমতি নেই, কিন্তু প্রবীণদের মনে সন্তানদের না আসার তীব্র হাহাকার।

Feb 28, 2026 - 05:17
 0  2
‘বৃদ্ধাশ্রমে ইফতার আসে, কিন্তু সন্তানেরা আসে না’
×

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে অবস্থিত ‘ওল্ড অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হোম’-এর বারান্দা রমজানের বিকেলে ইফতারের নানা আয়োজনে ভরে ওঠে। ব্যক্তি উদ্যোগ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফল, পিয়াজু, ছোলা ও শরবতসহ প্রচুর খাবার পৌঁছালেও সেখানকার বাসিন্দাদের মনে সবচেয়ে বড় অভাব সন্তানদের উপস্থিতি। পল্লী চিকিৎসক ডা. সেবিনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত এই আশ্রমে প্রবীণদের প্রতিটি সন্ধ্যা কাটে সন্তানদের নীরব অপেক্ষায়।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আশ্রম প্রাঙ্গণে দেখা যায় এক ব্যস্ত চিত্র। কেউ রান্নাঘরে সাহায্য করছেন, কেউবা উঠানে লুডু খেলায় মেতেছেন। দূর থেকে একে একটি সুখী পরিবার মনে হলেও ভেতরের শূন্যতা ভিন্ন কথা বলে।

​বারান্দার এক কোণে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বসে থাকা ৫৮ বছর বয়সী বেলি খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "এমন সন্তান যেন কারো ঘরে না হয়।" সন্তানদের জন্য জীবনের সবটুকু উৎসর্গ করলেও শেষ বয়সে এসে জুটেছে অবহেলা আর এই আশ্রমে ঠাঁই। দুই বছর ধরে আশ্রমে থাকা গোলাপি বেগম (৫৫) বলেন, "এখানে আমরা সবাই সবার সহমর্মী। কেউ খোঁজ নেয় না, তবু মৃত্যু হলে এখানেই হোক।"

আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেবিন জানান, দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই নিবাসে বর্তমানে ১৮ জন প্রবীণ রয়েছেন। ইতোমধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং তাদের আশ্রম সংলগ্ন নিজস্ব কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এখানে থাকা প্রবীণদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, কিন্তু পরিবারের আঘাত বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তারা আজ এখানে।

​ডা. সেবিন বলেন, "এখানে আসা প্রবীণরা ভিক্ষা চান না, তারা চান সম্মান এবং সামান্য স্নেহের স্পর্শ। আমরা খাবার ও চিকিৎসা দিলেও সন্তানদের অনুপস্থিতিই তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট।" তিনি আরও জানান, বর্তমানে একার পক্ষে এটি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারি বা বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে এটিকে ২৫০ জনের একটি বড় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।

স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ:

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, "যারা এখানে আছেন তারা অপরাধী নন। জীবন দিয়ে সন্তানদের গড়ে তুলেও তারা আজ অবহেলার শিকার। আমাদের সবার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।"

​ইফতারের সময় সবাই একসাথে বসে হাসি-আনন্দে মেতে উঠলেও চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ নীরবতা। প্রতিটি সন্ধ্যা যেন এই প্রবীণদের মনে একই প্রশ্ন রেখে যায়—বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের চাওয়া কি শুধুই খাবার, নাকি একটু ভালোবাসা আর একটি স্পর্শ?