সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন করা না গেলেও সংস্কার সম্ভব: তাজুল ইসলাম
সংবিধানের কিছু মৌলিক স্তম্ভ সংসদ চাইলেও সংশোধন করতে পারে না, তবে গণভোটের ম্যান্ডেট নিয়ে সংবিধানের আমূল সংস্কার করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
সংবিধানে এমন কিছু অপরিবর্তনশীল মৌলিক স্তম্ভ বা কাঠামো রয়েছে, যা জাতীয় সংসদ চাইলেও সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারে না বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সংবিধানের আমূল ‘সংস্কার’ করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সমসাময়িক রাজনৈতিক টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সংশোধনীর সীমাবদ্ধতা ও আইনি চ্যালেঞ্জ:
অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের বরাত দিয়ে বলেন, “উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে, কেবল সংসদীয় সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বড় ধরনের কোনো রূপান্তর আনা হলে, ভবিষ্যতে তা গভীর আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের অন্যতম প্রধান কারণই ছিল যে, সেটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছিল।”
তিনি আরও যোগ করেন, “শুধুমাত্র প্রচলিত সংশোধনের পথে হাঁটলে সংবিধানে কোনো আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এতে কেবল বাহ্যিক বা কিছু কসমেটিক (ওপরিভাগ) পরিবর্তন আসবে, যা জাতির দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান করবে না।”
জুলাই বিপ্লব ও গণভোটের বৈধতা:
রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সাবেক এই চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার। গত ৫৪ বছর ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় ও কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতেই ছাত্র-জনতা রাজপথে সংস্কারের দাবি তুলেছিল। জুলাইয়ের এই রক্তাক্ত আন্দোলন কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য অনুষ্ঠিত হয়নি।”
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এই সরকার একটি রক্তাক্ত ও গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে, যা প্রচলিত সংবিধানের নিয়মিত কাঠামোর ভেতরে ছিল না। এ কারণেই সংবিধান আমূল সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ ও আলাদা আদেশের প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া, দেশের সর্বস্তরের জনগণ ইতোমধ্যে ‘গণভোটের’ মাধ্যমে এই সংস্কারের পক্ষে তাদের চূড়ান্ত রায় দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমেই সংবিধান সংস্কারের পূর্ণ নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি হয়েছে। জনগণ সচেতনভাবে এই রায় দিয়েছে এবং তা মেনে নিতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব পক্ষই বাধ্য।”
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ও বিএনপির আপত্তি:
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ বাতলে দিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রীয় সংস্কারের স্বার্থেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বা একটি ‘গণপরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর অধীনে নির্বাচিত সদস্যরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং গণপরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন।”
তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমানে সংবিধান ‘সংস্কার পরিষদের’ পরিবর্তে প্রথাগত ‘সংশোধন’ প্রক্রিয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকতে চাইছে। বিশেষ করে ‘সংস্কার পরিষদ’ নামটি নিয়ে দলটির ভেতরে প্রবল আপত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে।”


