বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় সবজির দাম: সরবরাহ সংকট নাকি সিন্ডিকেটের কারসাজি?

রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজির দাম বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে। বেগুন, করলা, শসা ও বরবটি সেঞ্চুরি পার করেছে। সবজির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডিম, মুরগি ও মাছের দামও।

Jul 17, 2026 - 17:40
 0  3
বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় সবজির দাম: সরবরাহ সংকট নাকি সিন্ডিকেটের কারসাজি?
×

সরবরাহ ঘাটতি আর কৃত্রিম সংকটের জাঁতাকলে পড়ে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সবজির দাম বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় গিয়ে ঠেকেছে। বাজারে বেশিরভাগ সবজির দামই এখন ‘সেঞ্চুরি’ (১০০ টাকা) পার করেছে। সবজির চড়া দামের কারণে মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ায় হঠাৎ করে চাহিদা বেড়েছে ডিমের, যার প্রভাব পড়েছে ডিম ও মুরগির বাজারেও।

​আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর নয়াবাজার, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের মূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী ও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে।

সবজির বাজারে আগুন, সেঞ্চুরির ঘরে বেগুন-শসা:

বাজারের বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, প্রতি কেজি বেগুন ও করলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে। হাইব্রিড শসা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং দেশি শসার দাম রূপ নিয়েছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে! এছাড়া ফুলকপি ও বরবটি ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে ও চিচিঙ্গার কেজি দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। জালি ও লাউ প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।

​কাঁচামরিচের বাজারেও চরম উত্তাপ দেখা গেছে। সাধারণ মানের কাঁচামরিচ ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ভালো মানের কাঁচামরিচ ২০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে আমদানির কারণে টমেটোর চড়া দাম কিছুটা কমে ১৫০ টাকায় (আগে যা ছিল ২২০-২৪০ টাকা) এবং পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ২৫ টাকায় অপরিবর্তিত থাকলেও পেঁয়াজের দাম বেড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। রসুন ও আদার দামও বাড়তি বলে জানিয়েছেন কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের।

চাহিদার চাপে বেড়েছে ডিম ও মুরগির দাম:

সবজির অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ ভোক্তারা ডিমের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে এখন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় ঠেকেছে। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৭৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ savage থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদ-নদী ও জলাশয় প্লাবিত হওয়ায় মাছের সরবরাহ কমেছে, যার ফলে বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫৫৫ টাকা এবং মাঝারি রুই ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

​তবে এলাকাভেদে বাজারদরে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে দাম কিছুটা কম হলেও পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে এই দাম আরও ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে।

একমাত্র স্বস্তি চালের বাজারে:

বাজারে একমাত্র স্বস্তির খবর দিচ্ছে চালের বাজার। বাজারে মাঝারি মানের চাল প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৮ টাকা, মোটা চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং সরু জাতের মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৭২ থেকে ৮৫ টাকা দরে স্থিতিশীল রয়েছে।

​সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির (TCB) তথ্য মতে, গত এক মাসের ব্যবধানে সরু ও মাঝারি মানের চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও মোটাজাতের চালের দাম প্রায় এক দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে।

ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য:

ব্যবসায়ীরা এই চড়া দামের পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সরবরাহ ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে সবজির সরবরাহ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। আগে যে পরিমাণ সবজি আসত, এখন তার চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম আসছে। কিন্তু বাজারে চাহিদা আগের মতোই আছে। পাইকারিতে চড়া দামে কেনার কারণে খুচরাতেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। নতুন সবজি বাজারে না আসা পর্যন্ত আগামী ১০-১৫ দিনে দাম কমার সম্ভাবনা কম।”

​তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, বন্যা ও বৃষ্টির উসিলা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদার সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। ভোক্তারা বাজারে প্রশাসনের নিয়মিত ও কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

ক্যাবের উদ্বেগ ও তদারকির তাগিদ:

নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের বলেন, “বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হলেও সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। এতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ত্রাহি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই চরম পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অত্যন্ত জরুরি।”