হরমুজের পর লোহিত সাগরও বন্ধের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা চালালে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট বন্ধ করতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নির্দেশ দিয়েছে ইরান।
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পর এবার লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটটিও সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো বা জাতীয় গ্রিডে আঘাত হানে, তবে পাল্টা বড় ধরনের পদক্ষেপ হিসেবে লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজের পথ বন্ধের প্রস্তুতি নিতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নির্দেশ দিয়েছে ইরান।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) উচ্চপর্যায়ের অন্তত তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চরম বিপর্যয়ের আশঙ্কা:
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের এই প্রধান রুটটি বন্ধ হয়ে গেলে তা চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে এক প্রলয়ংকরী সংকট তৈরি করবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তেহরানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে মিত্র হুথিদের কাছে জরুরি যুদ্ধবার্তা পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডে ভয়াবহ হামলার হুমকি দেওয়ার পরপরই তেহরান তাদের এই পাল্টা কৌশলের কথা হুথিদের জানিয়ে দেয়। তবে নির্দেশটি ঠিক কোন মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, তা সূত্রগুলো প্রকাশ করেনি। এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হুথি গোষ্ঠীর মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করে হুথিদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি:
হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল হোদাইদাহ, এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী এলাকা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীর কাছাকাছি ভারী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন সম্পন্ন করেছে হুথিরা। ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন ও পশ্চিমা দেশগুলোর যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর জন্য তারা এখন ইরানের চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
ইয়েমেনে আগে থেকেই অবস্থান করা ইরানের চালিকাশক্তি ‘ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর বিশেষ প্রতিনিধিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ লকডাউন বা বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
ভেস্তে গেছে সৌদি-হুথি যুদ্ধবিরতি, রিয়াদে উদ্বেগ:
এই আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই গত সোমবার নিজেদের একটি বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণের জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে দেশটির ওপর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। এর মাধ্যমে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার দীর্ঘ ৪ বছর ধরে টিকে থাকা ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতিটি সম্পূর্ণ ভেস্তে গেল।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক তরবজর্ন সলভড বলেন, “এই সংঘাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এসেছে। লোহিত সাগরের রপ্তানি অবকাঠামো এবং জাহাজ চলাচল যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র বিকল্প রুটটিও চিরতরে বন্ধ হবে।”
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান ও হুথিদের যৌথ এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও আশঙ্কার সঙ্গে দেখছে সৌদি আরব।
সংঘাতের সূত্রপাত যেভাবে:
চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। এর জবাবে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের প্রধান পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেয়। এরপর গত জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এই উত্তেজনা এখন লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়েছে।


