তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেটের আকার কত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট আজ জাতীয় সংসদে পেশ করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮... হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে একটি অত্যন্ত দুর্বল, চাপগ্রস্ত এবং নানা সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত অর্থনীতি হাতে পেয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এই চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যেই আজ জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে দলটি। গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেট উপস্থাপন করবেন।
বাজেটের খসড়া অনুযায়ী, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ের দুর্বল ভিত্তি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ৯ লাখ ৩৮... হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বাজেট।
বাজেটের আয়-ব্যয় ও আড়াই লাখ কোটির বিশাল ঘাটতি:
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৩৮... হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫... হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা মোট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৩... হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপির ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট।
রাজস্ব আয়ের উৎস: মোট আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে কর আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪... হাজার কোটি টাকা। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর ২৫... হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে ৬৬... হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঘাটতি অর্থায়নের উৎস: এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে পুরোপুরি ঋণনির্ভর অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ১২... হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ১৫... হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য থেকে রেকর্ড ১ লাখ ১৬... হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের বড় পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নবম পে-স্কেল ও খাতভিত্তিক বরাদ্দ:
নতুন বাজেটে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং বর্তমান সাধারণ মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাজেটে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে এবং এই নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাজেটে আলাদাভাবে ৩৫... হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
এবারের বাজেটে সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শিক্ষা খাতেই রেকর্ড ১ লাখ ৩৬... হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যার ভেতর উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার জন্য থাকবে ৫২৯... কোটি টাকা। এছাড়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎসাহিত করতে বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২... হাজার কোটি টাকা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫... কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের ভাবনা:
বাজেটের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ও ঘাটতি নিয়ে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন:
"বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হচ্ছে নিম্ন-আয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষকে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এই বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ মানুষের প্রকৃত আয় যদি কমে যায়, তবে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। শুধু বাজেট ঘোষণা নয়, রাজস্ব আহরণ, মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুসমন্বয় জরুরি।"
— ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি
"বাজেটের আকার বড় হলেও পুরো অর্থ গুণগতভাবে ব্যয় করার সক্ষমতা সরকারের আছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বছর শেষে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ অব্যয়িত থেকে যায় এবং রাজস্বের লক্ষ্যও পূরণ হয় না। ফলে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়। এখন সবচেয়ে বড় কাজ হবে সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো।"
মাহবুব আহমেদ, সাবেক অর্থ সচিব
উল্লেখ্য, এই বাজেটের খসড়ায় মূলত ১৩টি বিশেষ ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; যার মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম।


