পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করছে ইরান

​যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে ইরান তাদের সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করছে বলে নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

Jul 11, 2026 - 14:05
 0  6
পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করছে ইরান
×

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত ১৪ দফার ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) লঙ্ঘন করে ইরান তাদের একটি বিতর্কিত ও সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা পুনরায় নির্মাণ করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অতি সম্প্রতি সংগৃহীত কিছু চাঞ্চল্যকর স্যাটেলাইট বা ভূ-উপগ্রহের চিত্রে তেহরানের এমন গোপন তৎপরতার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ গত মাসে ওয়াশিংটনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির স্পষ্ট পরিপন্থি, যেখানে তেহরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

​আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’-এর সাথে যৌথভাবে এই নতুন স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

​চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘ভেঙে গেছে’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন। তবে নতুন এই ছবিগুলো প্রমাণ করছে যে, ট্রাম্পের ঘোষণার আগেই ইরান গোপনে চুক্তি লঙ্ঘন করেছিল কি না, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলার জবাবে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ইরানে নতুন করে বিমান হামলা শুরু করার পরেই এই স্যাটেলাইট তথ্যটি প্রকাশ্যে এলো।

স্যাটেলাইট চিত্রে যা দেখা গেছে

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ‘পারচিন’ নামক একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকায় পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য বিশেষ বিস্ফোরক তৈরি করা হতো বলে দীর্ঘদিনের সন্দেহ রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ এক ভয়াবহ বোমাবর্ষণে পারচিনের এই সাইটটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে হামলার আশঙ্কায় ইরান এই স্থাপনাটির চারপাশে একটি বিশাল কংক্রিটের সুরক্ষা প্রাচীরও তৈরি করেছিল।

​তবে জুন ও জুলাই মাসের নতুন স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, তেহরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই সাইটটি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত জুন মাসে যখন সমঝোতা স্মারকটি কার্যকর ছিল, তখনই ছবিতে দেখা যায় যে, ইরান বোমার আঘাতে তৈরি হওয়া বিশালাকার গর্তগুলো সাময়িকভাবে ঢেকে রেখেছে। পরবর্তীতে জুলাই মাসে সেগুলোর ওপর স্থায়ী তারের জাল বসানো হয়।

​এছাড়াও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর আরেকটি অন্যতম সন্দেহভাজন স্থান হলো ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। গত মাসের ছবিতে দেখা গেছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিন পরেই সেখানকার মাটির নিচের সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে সামরিক ও ভারী যানবাহন অনবরত আসা-যাওয়া করছে। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, এটি সম্ভবত ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের চুক্তির শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন ছিল। তবে প্রতিবেদনে স্বস্তির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসফাহান, ফোরদো এবং নাতাঞ্জের মতো ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে এখন পর্যন্ত নতুন করে কোনো হাত দেওয়া হয়নি।

ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি মেরামত

পারমাণবিক সক্ষমতার বাইরেও ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান শুধু পারমাণবিক সাইটই নয়, বরং তাদের কিছু প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখার ঘাঁটিতেও নতুন করে মেরামতের কাজ শুরু করেছে।

আমেরিকা-ইরান সমঝোতা স্মারকের শর্ত কী ছিল?

দীর্ঘদিন চলমান বৈরিতা ও শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গত জুন মাসে আমেরিকা ও ইরান এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং বিপরীতে ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া।

​সমঝোতা স্মারকে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ ছিল, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পুনর্ব্যক্ত করছে যে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা বিকাশ করবে না। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় বা ডাউন-ব্লেন্ডিং করার জন্য উভয় দেশ পারস্পরিক সম্মত পদ্ধতিতে কাজ করবে।’ কিন্তু নতুন এই স্যাটেলাইট চিত্রগুলো এখন বিশ্বমঞ্চে এই বড় প্রশ্নটিই রেখে গেল যে—চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইরান কি তবে বিশ্বের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল?