গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: ডা.শফিকুর রহমান

জনগণের গণভোটের রায় কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। কাকরাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে তিনি নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানান।

Jul 8, 2026 - 19:04
 0  4
গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: ডা.শফিকুর রহমান
×

দেশের পচা রাজনীতির আমূল পরিবর্তন এবং ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করতে দেশের মানুষ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, তাকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের এই ঐতিহাসিক রায় কখনো বৃথা যাবে না। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে সংসদে যেমন সবাই মিলে সোচ্চার হওয়া হবে, তেমনি রাজপথের আন্দোলনকেও আরও বেগবান করা হবে।

​আজ বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলস্থ ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (IDEB) মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

​‘অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং সব গণহত্যার বিচারের দাবিতে’ এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

নতুন কিংবা পুরোনো—কোনো ফ্যাসিবাদই কাম্য নয়:

দেশপ্রেমিক জনতাকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা এই দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসি। কোনো অশুভ শক্তিকে মাঝখান থেকে জলঘোলা করে খেলতে দেওয়া হবে না। আমাদের চোখ-কান সজাগ রেখেই সব কাজ চলবে এবং সময়মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা সাফ জানিয়ে দিতে চাই—বাংলাদেশে নতুন কিংবা পুরোনো কোনো রূপেই আর ফ্যাসিবাদ মেনে নেওয়া হবে না।”

জুলাই যোদ্ধাদের অপমান করলে যুবসমাজ জেগে উঠবে:

সেমিনারে জুলাই বিপ্লবের অবমাননাকারীদের তীব্র ভাষায় সতর্ক করে জামায়াত আমির বলেন, “ইদানীং জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে কোনো কোনো মহলে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। আপনারা সংযত হোন! নইলে জনগণের উত্তাল ঢেউ আর জোয়ারে সব খড়কুটো ভেসে যাবে। আমরা আইন হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নই, তবে কেউ যেন শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে জুলাইয়ের মহান বিপ্লবকে অপমান করার দুঃসাহস না দেখায়। দুঃসাহস দেখালে মনে রাখবেন—এই দেশের যুবসমাজ ও জনতা এখনো ঘুমিয়ে যায়নি। যারা সশস্ত্র বাহিনীর বুলেটের সামনে খোলা বুকে দেশপ্রেম নিয়ে দাঁড়াতে পারে, তারা আজও প্রস্তুত আছে।”

সংসদে দাঁড়িয়েই অন্তহীন প্রতারণার আত্মস্বীকৃতি:

নির্বাচন এবং চলমান সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে সরকারি দলের কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “গণভোট নিয়ে প্রতারণার বিষয়ে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়েই আত্মস্বীকৃত সাক্ষী পাওয়া গেছে। যদি ন্যূনতম হায়া-শরম থাকত, তবে এই আচরণ হতে পারত না। তবে একটা দিক থেকে ভালোই হয়েছে—জাতি এদের আসল চেহারা চিনে ফেলেছে। এখন আর অন্য কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। যেহেতু সংসদে দেওয়া এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ (নথি থেকে বাদ) করা হয়নি, তাই এই আত্মস্বীকৃতি ইতিহাসের অংশ হয়ে রেকর্ড হিসেবে থেকে গেল।”

​তিনি আরও বলেন, “তারা (সরকারি দল) এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিল ‘জুলাই সনদ একটা অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। আর আজ এই সংসদেই প্রমাণ করল যে তারাই মূলত জাতির সঙ্গে অন্তহীন প্রতারণা করেছে। তাদের কাছে নিজেদের আপন সঙ্গীদের রক্তের কোনো মূল্য নেই। মূল্য থাকলে সংকটে আগে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াত। আমাদের অপবাদ দেওয়া হয় আমরা নাকি নির্বাচন চাই না। নির্বাচন না চাইলে আমরা নির্বাচনে অংশ নিলাম কীভাবে?”

দল-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারও ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল:

ড. শফিকুর রহমান গত নির্বাচনের ভেতরের চিত্র তুলে ধরে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচন চেয়েছিলাম, কিন্তু নির্বাচনের নামে কোনো পাতানো ষড়যন্ত্র চাইনি। কিন্তু ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে দল-নিরপেক্ষ পরিচয়ের অন্তর্বর্তী সরকারও সেই ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল। তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নীল নকশা করে ১১ দলকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

​ষড়যন্ত্রের পরও কেন বিশৃঙ্খলা করা হয়নি, তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “সাড়ে ১৭ বছরের জুলুমের পর এই ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে যদি আমরা সেদিন নির্বাচনের ফলাফল পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে রিভোল্ট (বিদ্রোহ) করতাম, তবে দেশে যে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো, তার শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকত কেউ জানত না। ১১ দল চরম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে বলেই দেশ রক্ষা পেয়েছে। তবে নির্বাচনের ফল মেনে নিলেও আমরা গণভোটের রায়কে কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেব না।”

বিএনপি ওয়াদা থেকে সরে গেছে, আমরা পারব না:

সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে সাবেক রাজনৈতিক মিত্র বিএনপির নাম উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনে এ পর্যন্ত ১০-১১ বার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু আমরা স্পষ্ট বলতে চাই—সংশোধনের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি কমিটির প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া সংশোধন কমিশনের জন্য দেশের মানুষ গণভোট দেয়নি; গণভোট হয়েছে ফ্যাসিবাদের মূল কেটে দেওয়ার জন্য। আজ অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়—বিএনপি তাদের আগের ওয়াদা থেকে সরে গিয়েছে। কিন্তু আমরা জাতির সাথে বেঈমানি করতে পারব না। আমরা জাতিকে যে কথা দিয়েছিলাম, সেই অবস্থানেই অটল আছি।”

​কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বর্তমান আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে মজলুম ছিলাম, একসঙ্গে জেল খেটেছি, রাজনীতি করেছি, এমনকি সরকারও গঠন করেছি। কিন্তু এখন কোনো কোনো রাজনৈতিক বন্ধুর বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের চোখেই দেখেননি! এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে গেলেন? তবে স্মরণ হতে বেশি সময় লাগবে না, একটা রাজনৈতিক ঝাঁকুনিই যথেষ্ট।”

মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই:

জেল-জুলুম ও ফাঁসির ভয়কে তোয়াক্কা করেন না জানিয়ে জামায়াত আমির দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “সংসদে একজন আমাদের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাদের বলতে চাই—গত ৫৫ বছর ধরে চরম পরিণতি ও নির্যাতন দেখে দেখেই বাংলাদেশ আজ এই জায়গায় এসেছে। আমাদের সর্বোচ্চ পরিণতি কী হতে পারে? ফাঁসির তক্তা অথবা স্বৈরাচারের একটা বুলেট। আমরা দেশের জন্য, জাতির জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবসময় প্রস্তুত আছি। আমাদের লড়াই থামবে না, ইনশাআল্লাহ জনগণের চূড়ান্ত বিজয় হবেই।”

​সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি প্রমুখ।