চট্টগ্রামে তিন দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে দোকানপাট

টানা তিন দিনের অতিভারি বর্ষণে ডুবল চট্টগ্রাম। ৪৩ বছরের মধ্যে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ডে তলিয়েছে হাজারো দোকান ও রেললাইন। বিদ্যুৎ ও বন্দর সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত।

Jul 8, 2026 - 13:02
Jul 8, 2026 - 13:04
 0  3
চট্টগ্রামে তিন দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে দোকানপাট
×

বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা তিন দিনের নজিরবিহীন অতিভারি বর্ষণে স্থবির হয়ে পড়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। নগরের প্রধান প্রধান হাটবাজার, বাণিজ্যিক এলাকা থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার হাজার হাজার বাসাবাড়ি এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে ভাসছে। রেকর্ড ভাঙা এই জলাবদ্ধতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ায় চরম লোকসান ও দুর্ভোগে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে রেল যোগাযোগ বন্ধ, বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

​আজ বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) সকাল থেকে বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক আকার ধারণ করেছে।

ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ, বন্ধ ট্রেন ও বন্দর কার্যক্রম:

টানা বৃষ্টিতে নগরের পতেঙ্গা এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়কের একাংশ ধসে পড়েছে। ধসে যাওয়া ও তলিয়ে যাওয়া রাস্তার কারণে সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন। এর ওপর নগরের ভেতরের রেললাইন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সাথে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার রেল যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অন্যদিকে সমুদ্র প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ‘চট্টগ্রাম বন্দর’-এর বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও জেটির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গাছ উপড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, অন্ধকারে বহু এলাকা:

আজ বুধবার সকাল থেকে ঝোড়ো হাওয়ার কারণে নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়েছে। এতে তার ছিঁড়ে যাওয়া এবং কয়েক স্থানে শর্টসার্কিট হয়ে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ায় নগরের সিংহভাগ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় এবং বাসাবাড়িতে নোংরা পানি ঢুকে পড়ায় গৃহস্থালির আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ বাসিন্দারা।

রেয়াজউদ্দীন বাজারে কোটি টাকার ক্ষতি:

নগরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার ‘রেয়াজউদ্দীন বাজার’ সহ খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই এবং বিভিন্ন বিপণিবিতানের নিচতলার দোকানপাটে হু হু করে পানি ঢুকে পড়েছে। আকস্মিক পানি ঢুকে যাওয়ায় চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও কাপড়ের গাঁটসহ বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য পানিতে তলিয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পণ্য সরানোর ন্যূনতম সময়টুকু তারা পাননি।

ভাঙল ৪৩ বছরের জুলাইয়ের রেকর্ড:

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গতকালের ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং ৪৩ বছরের মধ্যে জুলাই মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার এবং ২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে রেকর্ড হয়েছিল ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি।

​চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “১৯৮৩ সালের জুলাইয়ের পর এবারই প্রথম জুলাই মাসে চট্টগ্রামে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হলো, যা ৪৩ বছরের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।” সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩৯৪.৩ মিলিমিটার এবং রাত ৯টা পর্যন্ত ৩৬৪.৫ মিলিমিটার অবিরত বৃষ্টি ঝরেছে।

আগামী ৪৮ ঘণ্টা আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস, পাহাড়ধসের শঙ্কা:

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বেলা ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও আরও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে।

​এই অতিভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর নিচু এলাকার চলমান জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও মারাত্মক ভূমিধস বা পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত এবং নদী বন্দরসমূহকে ২ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছে।