জুলাই শহীদদের কতবার শহীদ করা আমরা সহ্য করব: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
১৬ বছরের শহীদদের স্মৃতি রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদের ‘মিডিয়া-কালচারাল উইং’-এর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আইনি প্রটেকশন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দলগতভাবে আওয়ামী লীগের অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে স্পষ্ট কথা বলেছেন। তাঁকে এবং বর্তমান সরকারকে এই দৃঢ় অবস্থানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
তবে আমি আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি আরেকটি বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ফ্যাসিবাদ কখনো একা একা তৈরি হয় না, একা টিকে থাকতেও পারে না। এটার জন্য একটা কৃত্রিম আদর্শিক ঢাল তৈরি করে দেয় একশ্রেণীর সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা—যেটিকে সবাই এক নামে ফ্যাসিবাদের ‘মিডিয়া-কালচারাল উইং’ বলে ডাকে।
ফ্যাসিবাদের ‘মিডিয়া-কালচারাল উইং’ ও সাবহিউমান তত্ত্ব:
এরাই বিগত দেড় দশকে মুক্তিযুদ্ধের নামে, প্রগতিশীলতার প্রলেপ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধীদের ‘সাবহিউমান’ বা নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করেছিল। আওয়ামী লীগ বাদে দেশের বাকি সবাইকে এরা ‘রাজাকার’ বানিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যাযোগ্য করে তুলেছিল। এরা অন্যদের তো বটেই, এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সাবহিউমান বানিয়েছিল। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বেরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কী দশা হয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়।
কিন্তু আজ ফ্যাসিবাদের সেই সম্মতি উৎপাদনকারী (Consent Manufacturers) এবং এখনো যারা খুব দুর্বল কিছু কৌশলে ফ্যাসিবাদকে ঢাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রীয় করণীয় কী? সিনিয়র সাংবাদিক, নামী শিল্পী বা মডেল—এ রকম নানা রকমারি নামের আড়ালে বেশ কিছু আওয়ামী ‘ফুট সোলজার’ এখনো সুকৌশলে এসব কাজ করে যাচ্ছেন।
‘আমাদের শহীদরা দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার শহীদ হয়’:
এরা যখন জুলাই বিপ্লব এবং বিগত ১৬ বছরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ভিকটিমদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা টকশোতে কটাক্ষ করে, তখন আমাদের করণীয় কী? ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, জুলাইয়ের পরাজিত শক্তি পাগল হয়ে কী আবোলতাবোল বলছে না বলছে, এটাকে মূল আলোচনায় আনারই দরকার নেই।
কিন্তু আমি বা আমরা তো এই আন্দোলনে কাউকে হারাইনি। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি কোনো বড় বিষয় নয়। আসল বিষয় হচ্ছে—সেই সন্তানহারা মা, বাবা, স্বামীহারা স্ত্রী এবং সর্বস্বান্ত পরিবার-পরিজন। আমরা কি তাদের রক্তক্ষরণ ও অনুভূতিকে কোনো গুরুত্ব দেব না?
নাকি আমরা এই খুনিদের পেদো ও ল্যাসপেন্সারদের (Lascivious/Lancers) এভাবে প্রকাশ্য রাজপথে বা মিডিয়ায় ছুরি হাতে ঘুরে বেড়াতে দেব? আর তারা সেই কথার ছুরি দিয়ে আমাদের শহীদদের পবিত্র স্মৃতিকে কেটে ফালা ফালা করবে? তারা আজ বুক ফুলিয়ে বলছে—‘জুলাইতে কিছু হয় নাই, সব মেটিকিউলাস ডিজাইন (পরিকল্পিত ছক)’!
শহীদ ইয়ামিনরা যেমন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে শেষ একবার দম নেওয়ার জন্য দুনিয়ার সব বাতাস টেনে ভেতরে নেওয়ার আকুল চেষ্টা করছিল; ইয়ামিন, ওয়াসিম, সাঈদ, মুগ্ধ কিংবা নাইমাদের বাবা-মায়েরা যখন আজ মিডিয়ায় এসব নির্মম কটাক্ষ শোনে, তখন তাদেরও বুক ফেটে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রতিবার যখন এই মানবিক বোধশূন্য জম্বিরা টিভিতে বা পত্রিকায় এসব বিষোদ্গার করে, আমাদের শহীদরা দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, অজস্রবার নতুন করে শহীদ হয়। একটা শহীদের বাবা কিংবা মা কতবার এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করবেন? কেন করবেন? এর কি কোনো প্রতিকার নেই?
এমনকি যখন গুমের ভিকটিমদের পরিবারকে রক্তাক্ত করে অবলীলায় বলা হয়—‘গুম বলে দেশে কিছু নাই’—তখন তার প্রতিকার কী?
রাষ্ট্রের প্রতি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর জরুরি প্রস্তাবনা:
রাষ্ট্রকে এর শক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৬ বছরের সব শহীদের খুনিদের বিচারের ব্যবস্থাই শুধু করলে হবে না; শহীদদের স্মৃতি ও তাদের পরিবারকে এই ফ্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ এটি এক রক্তক্ষয়ী মহাবিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়! এটাকে কোনোভাবেই ‘স্বাভাবিক সময়’ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে।
আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও দাবি:
বিশেষ আইন প্রণয়ন: যদি প্রয়োজন হয়, ফ্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারী ও বুদ্ধিবৃত্তিক দোসরদের বিচারের জন্য বিশেষ আইন করা হোক।
কমিশন গঠন: নিদেনপক্ষে একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ (Truth and Reconciliation Commission) গঠন করা হোক।
ভিকটিম প্রটেকশন অ্যাক্ট: পাশাপাশি অবিলম্বে আইন করা হোক—যাতে ভিকটিমদের স্মৃতিকে অশ্রদ্ধা বা জুলাই বিপ্লবকে কটাক্ষ করে এমন কোনো কিছু গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়। অ্যাটলিস্ট বুক চাপড়ানো এই পরিবারগুলোর ভেতরের ক্ষত শুকানোর সময়টা পর্যন্ত ভিকটিমদের পরিবারকে এই রাষ্ট্রীয় প্রটেকশন দেওয়া হোক।
একবার ভাবেন তো, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো দালালের কি এই সাহস হতো যে টিভি শোতে এসে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে এসব ধৃষ্টতা দেখাবে? চব্বিশের এই বিপ্লব একাত্তরের মতো এত ব্যাপক ক্যানভাসের না হলেও, এটি বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত ও বীরত্বপূর্ণ গণ-অভ্যুত্থান। এটা তো এই জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর স্বাধীন দেশে দ্বিতীয়বার পরাধীন দশা থেকে মুক্তির চূড়ান্ত যুদ্ধই ছিল।


