এক ঢিলে বহু পাখি মারার চেষ্টা’: শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তায় দিল্লির কূটনৈতিক কৌশল

আগামী ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা। দিল্লির পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত এক ঢিলে বহু পাখি মারার চাল চালল।

Jul 18, 2026 - 13:59
 0  4
এক ঢিলে বহু পাখি মারার চেষ্টা’: শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তায় দিল্লির কূটনৈতিক কৌশল
×

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে (২০২৬) দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চান। দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁর এই আকস্মিক বক্তব্য সামনে আসার পর বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

​তবে দিল্লির কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে এখনই দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট ‘চূড়ান্ত ঘোষণা’ হিসেবে দেখছেন না। বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য এটি শেখ হাসিনার এক ধরনের ‘জল মাপার চেষ্টা’ বলেই মনে করছেন তারা।

দিল্লির সাউথ ব্লকের অবস্থান:

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে দিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন—ভারত নিজে থেকে শেখ হাসিনাকে ডেকে এনে আশ্রয় দেয়নি, আবার এখন তাকে জোর করে তাড়িয়েও দিচ্ছে না।

​ভারতের সাউথ ব্লকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজের মতো যাচাই করে তিনি যদি স্বদেশে ফিরতে চান, ফিরবেন। আর যদি মনে করেন ভারতেই থাকবেন, তাহলে তাই।”

রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে আত্মসমর্পণের ঘোষণা:

গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, আগামী ডিসেম্বরে হাজারো নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা দেশের প্রচলিত আদালতে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।

​শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, “দেশে ফিরলে আমাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি ফাঁসিও দেওয়া হতে পারে। আমি এসব পরিণতি জেনেও দেশে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

বিবিসির অনুসন্ধানে দিল্লির ‘এক ঢিলে বহু পাখি’র কৌশল:

শেখ হাসিনার এই স্পর্শকাতর বক্তব্য নিয়ে দিল্লির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক এবং ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। এসব আলোচনায় প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে:

​পাঁচ মাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ: শেখ হাসিনা এ কথা বলেছেন বলেই যে তিনি ডিসেম্বরেই ভারত থেকে ঢাকায় পা রাখবেন, তা নিশ্চিত নয়। মাঝের এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কোন দিকে গড়ায়, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার কী প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং আন্তর্জাতিক মহল শেখ হাসিনার বিষয়ে কী মনোভাব পোষণ করে, তাঁর প্রত্যাবর্তন প্রধানত এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

​ভারতের প্রচ্ছন্ন সম্মতি: শেখ হাসিনা কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্ত না নিলেও, ভারতের প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত বা সম্মতি ছাড়া তিনি এমন হাই-প্রোফাইল বক্তব্য দিতে পারতেন না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত সরকারও মনে করছে এই ঘোষণায় দিল্লির ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক লাভই বেশি। শেখ হাসিনা নিজ দায়িত্বে দেশে ফিরে গেলে প্রায় দুই বছর ধরে চলা দিল্লির ‘কূটনৈতিক অস্বস্তি’ থেকে মুক্তি পাবে ভারত। আর বাংলাদেশ সরকার যদি তাঁকে ঢুকতে না দেয় বা বাধা সৃষ্টি করে, তবে দিল্লি আন্তর্জাতিক মহলে বলতে পারবে—শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঢাকা তাঁর জন্য অনুকূল বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এ কারণেই শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে ‘এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারা’র কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বল এখন বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের কোর্টে ঠেলে দেওয়া হলো।

পর্দার আড়ালের দরকষাকষি ও রাজনৈতিক বার্তা:

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার বিষয়ে এবার সত্যিই আন্তরিক। কারণ অস্তিত্বসংকটে পড়া আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁর ফিরে আসা প্রয়োজন। পিনাকরঞ্জন বলেন, “শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করবেন। বিচার চলাকালে তাঁকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হতে পারে। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে নতুন করে বড় দরকষাকষি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।”

​অন্যদিকে দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায়চৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এই মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দিতে চান যে—আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে রাজনীতি থেকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার চেষ্টা তিনি নিজে দেশে ফিরে রাজপথে প্রতিহত করবেন।

ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতাদের সংশয়:

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অবৈধভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মধ্যে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে চরম মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আতঙ্ক দেখা গেছে। অনেক সাবেক এমপি-মন্ত্রী মনে করেন, বর্তমান জটিল রাজনৈতিক ও মামলার পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন, তা দেশের বর্তমান প্রশাসন ও বিএনপি চাইবে না।

​নেত্রীর সাথে একই বিমানে দেশে ফিরতে কতজন প্রস্তুত—এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাবেক একজন ক্যাবিনেট সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শেখ হাসিনার বিচারের দিকে তো পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ নেতা-কর্মীরা দেশে ফিরলে তাৎক্ষণিকভাবে পুরনো ও নতুন মিথ্যা মামলায় কারাগারে যেতে হবে, যা মিডিয়াও জানতে পারবে না। ফলে শেষ পর্যন্ত কতজন নেতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীর বিমানসঙ্গী হবেন, তা এখনই বলা মুশকিল।”