হিন্দুত্ববাদকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সামরিক শক্তি দিয়ে নয়: ড. মাহমুদুর রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুধর্ম এক নয়। শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতকে সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুধর্মকে কখনো এক করে দেখার সুযোগ নেই। যেমন ইহুদি ধর্ম এবং জায়োনিজম এক বিষয় নয়, তেমনি সনাতন হিন্দুধর্ম ও রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদও এক নয়। হিন্দুত্ববাদের মূল ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে মুসলমানদের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষের ওপর। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্র ভারতকে সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে বেদুইন প্রকাশনীর উদ্যোগে প্রকাশিত দুটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে এ এম আব্দুল্লাহ রচিত ‘বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব’ এবং সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনীর মূল গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ ‘হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা: মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং মুসলমান’—এই বই দুটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
আন্দোলন বা অভ্যুত্থান নয়, এটি ছিল ‘জুলাই বিপ্লব’:
বক্তব্যের শুরুতে মাহমুদুর রহমান বই দুটির ঐতিহাসিক ও একাডেমিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। ‘বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব’ বইটির নামকরণের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “আমি সব সময় জুলাইয়ের গণআন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ বলি। অনেকেই এটিকে সাধারণ আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান বলতে চান। কিন্তু আমি মনে করি এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব। কারণ বিপ্লব মানেই হচ্ছে দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত ও পচে যাওয়া ব্যবস্থাকে ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। যারা বিদ্যমান ফ্যাসিবাদের ক্ষমতাকাঠামো বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, তারা স্বাভাবিকভাবেই ‘বিপ্লব’ শব্দটি এড়িয়ে চলেন এবং ‘স্ট্যাটাস কু’ বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চান।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বইটি এমন এক সময়ে লেখা হয়েছে, যখন মানুষের স্মৃতি এখনো সতেজ। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে-পরে কী ঘটেছিল, তা মানুষের মনে স্পষ্টভাবে রয়েছে। ফলে ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ কমে যায়।” তবে বর্তমান প্রজন্মে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া এবং মোবাইল-টেলিভিশনের স্ক্রিনে আটকে থাকাকে ইতিহাস সংরক্ষণের বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
হিন্দুত্ববাদ বনাম হিন্দুধর্ম এবং ভারতের প্রসঙ্গ:
দ্বিতীয় বই ‘হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা’ সম্পর্কে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, “এটি একটি অসাধারণ একাডেমিক ও গবেষণাধর্মী কাজ। আমাদের বুঝতে হবে হিন্দুত্ববাদকে কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে দেখলে মস্ত বড় ভুল হবে, এটি মূলত একটি আগ্রাসী রাজনৈতিক মতাদর্শ। তাই এর মোকাবিলাও রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে করতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তাদের সঙ্গে সংঘাতের পথে গিয়ে পারা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ যদি জ্ঞান, গবেষণা, বিজ্ঞান ও চিন্তাশক্তিতে এগিয়ে যেতে পারে, তবে কোনো বৈরি শক্তিই আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।”
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অধঃপতনের ব্যবচ্ছেদ করে তিনি বলেন, “মুসলমানরা আজ মূলত জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের অভাবে বিশ্বমঞ্চে পিছিয়ে পড়েছে। বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও জনসংখ্যা থাকলেও জ্ঞান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামরিক সক্ষমতা—এই তিন ক্ষেত্রে শক্তিশালী না হলে কোনো জাতি বিশ্বনেতৃত্ব দিতে পারে না।”
ইতিহাসের মোড় ও হিন্দুত্ববাদের বিকাশ:
ড. মাহমুদুর রহমান হিন্দুত্ববাদের ঐতিহাসিক পটভূমি উল্লেখ করে বলেন, “১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ, ১৮NT সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক অবস্থান—এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা না বুঝলে হিন্দুত্ববাদের বর্তমান চরিত্র বোঝা অসম্ভব। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যত বড় প্রতিরোধ হয়েছে, তার অধিকাংশের নেতৃত্বে ছিলেন মুসলমানরা। পক্ষান্তরে, ১৯০৫ সালে যারা বঙ্গভঙ্গের চরম বিরোধিতা করেছিল, তাদেরই একটি অংশ ১৯৪৭ সালে এসে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো রাষ্ট্রের অংশ না হওয়ার জিদ থেকে নিজেরা বাংলা ভাগের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই ধারা থেকেই পরবর্তীতে আরএসএস ও বিজেপির মতো রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটেছে। ইতিহাস না জেনে শুধু আবেগ ও স্লোগান দিয়ে কোনো আগ্রাসী মতাদর্শের মোকাবিলা করা যায় না।”
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে বিতর্ক করুন, প্রশ্ন করুন, গবেষণা করুন; কিন্তু না পড়ে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। জ্ঞানচর্চাই একটি স্বাধীন জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ:
বেদুইন প্রকাশনীর প্রকাশক আনাস বিন মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম এবং বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি আলী হোসেন ওসামা।
অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের গুলিতে চোখ হারানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী ও ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক খান জসিম। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিবৃন্দ লেখক ও অনুবাদকদের সাথে নিয়ে বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন।


