বর্তমান সংসদ মজলুমের সংসদ: ব্যারিস্টার কায়সার
বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি জানান, সংসদের প্রায় ৯৯ শতাংশ সদস্যই অতীতে গুম, আয়নাঘর বা কারাবরণের শিকার হয়েছেন।
দেশের বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, “এই সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই অতীতে গুম, আয়নাঘরে বন্দিদশা, নির্মম নির্যাতন, নির্বাসন কিংবা ফাঁসির মঞ্চের মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এ ধরনের আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সংসদ সদস্যের উপস্থিতি বিশ্ব সংসদীয় ইতিহাসেই বিরল।”
আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) জাতীয় বার্তা সংস্থা ‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’ (বাসস)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার এসব কথা বলেন।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “দেশের ১৮ কোটি মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন আমাদের এই জাতীয় সংসদ। জনগণ প্রত্যাশা করে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংসদের প্রতিটি অধিবেশন প্রত্যক্ষ করছেন। ফলে প্রতিটি বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও আচরণ সরাসরি জনগণের নজরদারিতে রয়েছে। তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদের দায়িত্ব অনেক বেশি।”
নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সংসদের ভূমিকা
সংসদ পরিচালনার বিষয়ে নিজের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, “দায়িত্ব পালনকালে আমার মূল ভিত্তি হবে পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার। সরকারি দল যেমন তাদের অবস্থান তুলে ধরবে, ঠিক তেমনি বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনার অবাধ সুযোগ পাবে। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স, ভারত ও কানাডার সংসদীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে বিতর্ক ও মতপার্থক্যকে উৎসাহিত করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ—এই তিন অঙ্গের মধ্যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো আইনসভা। তাই জাতীয় সংসদই হবে রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার আসল কেন্দ্রবিন্দু। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ গড়ার স্বপ্নও এর মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে।”
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস মূল্যায়ন
সাক্ষাৎকারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, “১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৯ সালে একটি ঐতিহাসিক কার্যকর সংসদ উপহার দেন।”
তিনি আরও বলেন, “পরবর্তীতে এরশাদের স্বৈরশাসনের পর ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান শেষে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে আসে। তবে ওয়ান-ইলেভেন, ২০০৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং পরবর্তী ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে সেই ধারা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
পরিশেষে কায়সার কামাল স্মরণ করিয়ে দেন, “ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আজকের এই সংসদ গঠিত হয়েছে।”


