শজিমেক ঘটনায় ৫ ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার, তদন্ত নিয়ে তৃণমূলে প্রশ্ন
শজিমেক হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগে ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকে বহিষ্কারের পর সিদ্ধান্তের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূলের নেতাদের পোস্টে ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রকাশ দেখা গেছে।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগে পাঁচ নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বগুড়া শহর ছাত্রদল।
তবে দ্রুত বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তের পর দলটির তৃণমূলের একাংশে ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বহিষ্কারের আগে অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত, অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে শজিমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চিকিৎসকদের অভিযোগ, স্বজনেরা বহিরাগতদের নিয়ে এসে তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে বেশ কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন। পরে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতিতে যান ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
এ ঘটনায় চিকিৎসকদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। পরে বগুড়া শহর ছাত্রদল পাঁচ নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
বহিষ্কৃতরা হলেন—১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নাফিউল ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনির হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. প্রান্ত ইসলাম, সদস্য রাকিবুল হাসান রাকিব এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শিহাব।
বহিষ্কার বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, তদন্তের ফলাফল কিংবা অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
আর এখানেই শুরু হয়েছে প্রশ্ন।
দলটির তৃণমূলের একাংশের প্রশ্ন—গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সামস আল ইসলাম সাগর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আপনি নেতা; কর্মীর জন্য যদি স্ট্যান্ড নিতে না পারেন সেই নেতৃত্ব সময়ের সাথে হারিয়ে যাবে।” একটি দোকানে আসবাবপত্র থাকলে যেমন দোকানটি সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন লাগে, তেমনি কর্মী ছাড়া কোনো নেতার দিকেও কেউ তাকাবে না উল্লেখ করে তিনি কর্মীদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়ার আহ্বান জানান।
অন্য একটি পোস্টে সামস আল ইসলাম সাগর লেখেন, “ভুল চিকিৎসায় স্বজন হারিয়ে রাগে ক্ষোভে হয়তো প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। অথচ দেখে মনে হচ্ছে এরা ঐখানে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা খাইছে। কী নির্মম হামলা তাদের ওপর করা হইছে।”
তিনি আরও লেখেন, “প্রকৃতি একদিন বিচার করবে ইনশাআল্লাহ। ধিক্কার ঐ মেরুদণ্ডহীন নেতাদের, যারা তদন্ত না করে সরাসরি বহিষ্কারের প্রেস রিলিজে স্বাক্ষর করেছে।”
সাগরের এই বক্তব্যে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি যে ‘ভুল চিকিৎসা’র কথা উল্লেখ করেছেন, সেটিও তাঁর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; এর সত্যতা পৃথকভাবে যাচাই করা হয়নি।
অন্যদিকে সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, “মিছিলে যার গলা সবসময় সবার চেয়ে উঁচুতে থাকত, আজ সে নিথর দেহ হয়ে পড়ে আছে। রাজপথ রক্তে ভিজেছে, কিন্তু বুকভাঙা কান্নার আওয়াজ শোনার কেউ নেই। ছাত্রদলের রাজনীতি কি তবে শুধু হারানোরই গল্প?”
দুই নেতার এসব বক্তব্যের পর বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং দলীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় দল কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে—এমন অবস্থানের পাশাপাশি তৃণমূলের প্রশ্ন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করেই কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।


