আয়নাঘর’ বিগত সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ চরিত্রের চরম বাস্তবতা: ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর
উত্তরার র্যাব-১ কার্যালয়ে 'আয়নাঘর' পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউটররা। এটিকে বিগত সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের চরম বাস্তবতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
রাজধানীর উত্তরার র্যাব-১ কার্যালয়ে বিতর্কিত ‘আয়নাঘর’ (টাস্ক ফোর্সেস ইন্টারোগেশন সেল বা টিএফআই) সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউশন টিম। পরিদর্শন শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “এই অন্ধকার ঘরগুলো কোনো কল্পকাহিনি বা রূপকথা নয়; বরং এটি বিগত সরকারের চরম ‘ফ্যাসিবাদী’ চরিত্র এবং অমানবিক শাসনের বাস্তব দলিল।”
আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) সকালে ট্রাইব্যুনালের তিনজন সম্মানিত বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, গুমের শিকার ভিকটিম পরিবারের সদস্য এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদের সমন্বয়ে এক উচ্চপর্যায়ের যৌথ বিচারিক দল এ পরিদর্শন পরিচালনা করেন। এ সময় মামলার সংশ্লিষ্ট আসামিপক্ষের আইনজীবী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “সারা বিশ্ব যে ‘আয়নাঘর’ শব্দটির সাথে পরিচিত হয়েছিল, সেটি কতটা নির্মম ও অমানবিক টর্চার সেল ছিল—তা সরাসরি দেখার জন্য আমরা ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতাবলে এসেছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রুল ৪৬ (এ) এবং আন্তর্জাতিক রোম স্ট্যাটিউটের রুল ৭ ও ৭৩ ধারা অনুযায়ী এই ধরনের বিচারিক ও সরজমিন পরিদর্শনের স্পষ্ট আইনি অনুমোদন রয়েছে।”
২২টি গোপন কক্ষ ও দেয়াল দিয়ে তথ্য গোপনের চেষ্টা
চিফ প্রসিকিউটর জানান, যৌথ অভিযানে র্যাব-১-এর ভেতর ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২২টি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অমানবিক গোপন কামরা বা সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে।
তিনি শিউরে ওঠার মতো বর্ণনা দিয়ে বলেন, “২২টি কামরার ভেতরে ভিকটিমদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর গুম করে রাখা হতো। রুমগুলো এতটাই সরু ও ছোট ছিল যে একজন স্বাভাবিক মানুষের সোজা হয়ে লম্বা হয়ে শোয়ার মতো ন্যূনতম জায়গা ছিল না।”
তদন্তের কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎকালীন একটি চক্র সেখানে নতুন দেয়াল তুলে অনেক কক্ষ ঢেকে রেখে তথ্য গোপনের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। আমাদের ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়লেও, ভিকটিমদের দেওয়া ভৌগোলিক বর্ণনার সাথে খাপ না খাওয়ায় আমরা নতুন গাঁথা দেয়ালগুলো শনাক্ত করি। পরবর্তীতে সেই কৃত্রিম অবকাঠামো সরানোর পরই এই ভয়াবহ ও অমানবিক কক্ষগুলোর আসল চিত্র উন্মোচিত হয়।”
সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আরমানকে আটক রাখার প্রমাণ
সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার আরমানকে বেআইনিভাবে এই সেলে আটকে রাখার প্রাথমিক জোরালো প্রমাণ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি আরও বলেন, “এখনো প্রায় ২৫০ জনেরও বেশি নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমরা পাইনি। প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্যে জানা গেছে, সালাহউদ্দিন আহমেদকেও দীর্ঘ সময় ধরে র্যাব-১ এর এই গোপন অন্ধকূপের কোনো এক কামরায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল।”
মানবতাবিরোধী অপরাধ ও কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি
আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারা অনুযায়ী যেকোনো গ্রেপ্তারকৃত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ আদালতে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আয়নাঘরের মাধ্যমে সেই মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারকে চরমভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity)।”
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, কেবল মাঠপর্যায়ের র্যাব কর্মকর্তা বা বাস্তবায়নকারীরাই নন; বরং ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা শীর্ষ পদে আসীন ব্যক্তিরা এবং যে রাজনৈতিক দল এই ফ্যাসিবাদী কাঠামোর জন্ম ও মদদ দিয়েছিল—তাদের প্রত্যেককে আইনি প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তদন্তের ধারাবাহিকতায় আগামী শনিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত ডিজিএফআই-এর কার্যালয়ের ইন্টারোগেশন সেল (জিআইসি) পরিদর্শনের সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে। পুরো পরিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে আদালতে একটি আনুষ্ঠানিক মেমোর্যান্ডাম বা প্রতিবেদন পেশ করা হবে, যা মামলার মূল বিচারে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।


