তারা আমাকে হত্যা করবে, হয়তো আর দেখতে পাবেন না’, আইনজীবীর কাছে গাজার ডা. আবু সাফিয়ার আকুতি

ইসরায়েলি হেফাজতে চরম নির্যাতনের শিকার উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়া তাঁর জীবননাশের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর জরুরি মুক্তি ও সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

Jul 7, 2026 - 15:50
 0  3
তারা আমাকে হত্যা করবে, হয়তো আর দেখতে পাবেন না’, আইনজীবীর কাছে গাজার ডা. আবু সাফিয়ার আকুতি
×

এটাই শেষ। আপনারা হয়তো আমাকে আর কখনও জীবিত দেখতে পাবেন না। তারা মূলত আমাকে হত্যা করার জন্যই এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এনেছে।” ইসরায়েলি কারাগারে অবরুদ্ধ অবস্থায় নিজের আইনজীবীর সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাতে চরম জীবননাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে এই আকুতি জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের বিখ্যাত শিশুরোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. হুসাম আবু সাফিয়া।

​বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে উত্তর গাজার অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র ‘কামাল আদওয়ান হাসপাতালে’ ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত সামরিক অভিযানের সময় তাকে গ্রেফতার ও বন্দি করা হয়। তিনি ওই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে ফ্রন্টলাইনে থেকে মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

চেনাই যাচ্ছে না ডা. সাফিয়াকে, অমানবিক নির্যাতন:

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে ইসরায়েলি হেফাজতে আটকে রেখে ডা. আবু সাফিয়ার ওপর ভয়াবহ শারীরিক মারধর, মানসিক নিপীড়ন ও চরম অমানবিক দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতন ও অনাহারের কারণে বন্দিদশায় তাঁর শরীরের ওজন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

​সম্প্রতি ইসরায়েলি কারাগারের ভেতরের একটি ভিডিও ফুটেজে ডা. আবু সাফিয়াকে দেখা গেছে, যেখানে তাঁর শারীরিক কঙ্কালসার অবস্থার কারণে তাঁকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। তাঁর আইনজীবী ও চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন, ডা. সাফিয়ার মাথা, মুখমণ্ডল এবং চোখে নিষ্ঠুর আঘাতের দগদগে ও স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। আইনজীবীর সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাতের সময় তিনি তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন এবং যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারছিলেন না।

​‘আমার স্বামীকে বাঁচান’—স্ত্রীর করুণ আর্তনাদ:

ডা. আবু সাফিয়ার জীবন বাঁচাতে এবং তাঁকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ও বিশ্বনেতাদের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে তাঁর পরিবার। কারাগারে স্বামীর এমন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী অবর্ণনীয় আর্তনাদ করে বলেন, “বিশ্ববাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন, যেকোনো উপায়ে আমার স্বামীকে বাঁচান; তা না হলে আমরা তাঁকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলব।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তীব্র উদ্বেগ ও আলটিমেটাম:

এদিকে, ডা. আবু সাফিয়ার এমন মুমূর্ষু শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি এক জরুরি বিবৃতিতে বলেছে, “ইসরাইলি হেফাজতে থাকা অবস্থায় ডা. হুসাম আবু সাফিয়ার ওপর চালানো পদ্ধতিগত নির্যাতন ও পাশবিক দুর্ব্যবহারের কারণে তাঁর জীবন এখন আসন্ন মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন বিশ্বস্ত প্রতিবেদনে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে ডা. আবু সাফিয়াকে মুক্তি দিতে হবে।”

​অ্যামনেস্টি আরও যোগ করে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাঁর চূড়ান্ত মুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ ইসরায়েল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাঁর ওপর সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ রাখতে হবে, জরুরি ও পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অবিলম্বে তাঁর শারীরিক অবস্থা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে।

​উল্লেখ্য, ডা. হুসাম ইদ্রিস আবু সাফিয়া ফিলিস্তিনের একজন অত্যন্ত দক্ষ ও মানবিক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। ২০২৪ সালের শেষ দিক পর্যন্ত বর্বর ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখেও উত্তর গাজায় সচল থাকা চিকিৎসাসেবার শেষ বড় আশ্রয়স্থল ছিল তাঁর পরিচালিত কামাল আদওয়ান হাসপাতালটি। যুদ্ধক্ষেত্রে শিশুদের জীবন বাঁচাতে নিয়োজিত একজন প্রথম সারির চিকিৎসককে এভাবে আটকে রেখে হত্যার চেষ্টা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের বৈশ্বিক সংগঠনগুলো।

সূত্র: আরিয়ানা নিউজ